গ্যাস বিদ্যুতে গ্রাহকের বাকরুদ্ধ আর কতকাল? নাজিম উদ্দিন চৌধুরী এ্যানেল

পোস্ট করা হয়েছে 24/11/2014-10:39am:    যায় দিন ভাল.. আসে দিন খারাপ! বহুল পরিচিত এমন প্রবাদ বাক্যও বদলে যাচ্ছে। এখন বরং যায় বছর ভাল আসে বছর খারাপ অবস্থা। আসছে নতুন বছর ২০১৫ নিয়ে এবার আর বিগত বছর গুলোর মত উদ্দীপনা নেই, আছে কেবল উদ্বেগ। কেননা ১৬ নভেম্বর দেশের সব প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের সংবাদে আর ১৭ নভেম্বর দেশের সকল সংবাদপত্র সূত্রে জানাতে পারলাম পহেলা জানুয়ারী নতুন বছরের প্রথম দিন থেকেই গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়াতে যাচ্ছে সরকার! নতুন বছর উপলক্ষে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সরকারী ও বেসরকারী ,বহুজাতিক কোম্পানী সহ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এদেশে নতুন বছর আসলে বাড়ি ভাড়াসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের দাম বেড়ে যায়। দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে এবার সরকারী সেবা খাত হিসেবে বিবেচিত গ্যাস বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব স্বাধীনতার ৪২ বছরের ইতিহাস ভাঙতে যাচ্ছে। জনগনের সরকার গণ মানুষের প্রত্যাশার নতুন বছরের ১ম মাসে কি করে গ্যাস বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির চিন্তা করে তা আমার জানা নেই। পিডিবির সূত্রে জানা যায়, পাইকারী পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি করা না হলে চলতি বছরে পিডিবির ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকায় দাড়াবে। কুইক রেন্টার বিদ্যুতের মাসুল দিচ্ছে জনগণ। আর ভর্তুকির সুযোগ নিচ্ছে রাগব বোয়ালরা। ২০১৩ সালে ৪ জানুয়ারি নির্বাহী আদেশে জালানি তেলের দাম বাড়িয়েছিল। এবং ২০০৯ ও ১০ সালে সি এন জি গ্যাসের দুই দফা দাম বাড়িয়েছিল। ২০১০ সালে ৪ মে প্রতি ঘন মিটার গ্যাস ১৬ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ২৫ টাকা করা হয়েছিল। একই বছর ১৯ সেপ্টেম্বর ২৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা করা হয়। সিএনজি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির সাথে সাথে যাতায়াত ব্যয়ও বেড়ে যায়। ফলে পরিবহণ সেক্টরে ভাড়া নৈরাজ্য বছরের পর বছর লেগে থাকে। গ্যাস বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির আগাম অশুভ সংবাদ নতুন বছরের সমস্ত প্রত্যাশাকে ধুলিসাৎ করে দিয়েছে। এমনিতেই জানুয়ারী মাস আসলে আনন্দের চেয়ে আতংক বেশি থাকে ভাড়াটিয়াদের। বাংলার জমিদার প্রথা বন্ধ হলেও বাড়ী ওয়ালাদের জমিদারী অত্যাচার চলছে স্বাধীনতার ৪২ বছর ধরে, অতি মুনাফা লোভী অসৎ বাড়ী ওয়ালারা নানা অজুহাতে বছর শেষ হতে না হতেই জানুয়ারী মাস! আসলেই ঘর বাড়া বৃদ্ধি আগাম ঘোষণা দেয়। এবার আর বাড়ী ওয়ালা নয় সরকারই ঘোষনা দিচ্ছে! আসছে নতুন বছরের গ্যাস বিদ্যুৎ এর দাম আর এক দফা বাড়ানোর! বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড পিডিবি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিও জন্য ( বিইআরসি ) কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। গত ১৪ অক্টোবর এর প্রস্তাব সূত্রে জানা যায় বর্তমান (৪:৭০) চার টাকা সত্তর পয়সা থেকে (১.১৯) এক টাকা ঊনিশ পয়সা বাড়িয়ে ( ৫.৫১ ) পাঁচ টাকা একান্ন পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে আবাসিক খাতে এক চুলা ৪০০ টাকা থেকে এক লাফে ৮:৫০ টাকা আর দুইচুলা ৪৫০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। যার মূল্যবৃদ্ধি ১১২.৫০ শতাংশ থেকে ১০২.৯৪ শতাংশ পর্যন্ত! আশ্চার্য জনক হলেও সত্য এম মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব স্বাধীনতার ৪২ বছরে ইতিপূর্বে কখনো করা হয়নি। মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব ঠিক করে গণ সুনানীর আয়োজন কি দরকার? শুধু গণতান্ত্রিক দেশে নয় পৃথিবীর সব দেশে গ্যাস বিদ্যুৎ সরকারী সেবা খাত হিসেবে বিবেচিত। সেই সেবা খাতের মূল্যবৃদ্ধি তাও আবার দ্বিগুণের চেয়ে বেশি এই যেন অবাক দেশ নির্বাক জনগণ। দেশের বর্তমান সময়কাল এমনিতেই মানুষের ভাল যাচ্ছে না। দৃশ্যমান রাজনৈতিক সংকট না থাকলেও অস্থির রাজনীতির সহিংসতার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে প্রায়। এমন অবস্থার মধ্যে সরকার কি করে গ্যাস বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে জানি না। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি সরকার বিরোধী আন্দোলনের জন্য ইস্যু খুঁজতেছে। গ্যাস বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের চেয়ে বড় ইস্যু আর কি হতে পারে? অন্যদিকে সরকার একের পর এক ষড়যন্ত্রের গন্ধ খোঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সরকারের ভিতরে বাইরে যেসব নৈপথ্য ষড়যন্ত্র হচ্ছে তার লেশ কেশও খোঁজে পাচ্ছে না। দ্বিগুণের বেশি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি সাথে বিদ্যুৎ। যা দেশের কোন মানুষ মেনে নিতে পারবে না এর চেয়ে বড় ষড়যন্ত্র সরকারের বিরুদ্ধে আর কি হতে পারে। নতুন করে যে খবর ১৬ ও ১৭ নভেম্বর প্রকাশ পেয়েছে তা ১৮ ও ১৯ অক্টোবরও প্রকাশ পেয়েছিল। এমন খবরে ঐ সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন গুলো প্রতিবাদ মূখর হয়ে উঠে। পরে জানা গেল সরকার গ্যাস বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব ফেরৎ পাটিয়েছে। প্রস্তাব ফেরৎ পাঠানোর ১০ দিন পর আবার কি করে সেই প্রস্তাব ফিরে আসলো তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। জানি না সরকারের শুভ বৃদ্ধির উদয় হবে কিনা? আমার পাশের বাসার আহমদ হোসেন চাচা (৬০) নিয়মিত সংবাদ পত্র পড়েন, একজন দেশ সচেতন মানুষও বটে। দীর্ঘদিন বিদেশ করেছেন। গ্যাস বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির খবর পড়ে আমার কাছে রেগে ক্ষোভে আসলেন আর বল্লেন, তোমরা কিসের সাংবাদিক কিসের লেখক জনগণের কথা লিখতে পার না? গণমানুষের কন্ঠস্বরই তো সংবাদপত্র। সেই সংবাদপত্র ও সাংবাদিক সমাজ যদি অসহায় হয় তাহলে জনগন যাবে কোথায়? চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বল্লেন, সব গজব যেন গরীবের জন্য, আল্লাহ গজব কী..? চাচার দুঃখ ভরা এই আওয়াজ নিশ্চয়ই গণমানুষের। চাচার প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। তবে এই মূহুর্তে গ্যাস বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যাশার পরিপন্থি। জানি না প্রস্তাব পাশ হয় কিনা। যদি সত্যি সত্যি গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় জনজীবনে বিপর্যয় নেমে আসবে এতে সন্দেহের কোন কারণ নেই। গ্যাস বিদ্যুতের সাথে উৎপাদন বিপনন অঙ্গাঅঙ্কিভাবে জড়িত। ফলে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসসহ পরিবহণ ব্যয়ও বেড়ে যাবে অনেকাংশে যার মধ্যদিয়ে জনরোষ তৈরি হবে। আর এই গণরোষ যদি গণবিষ্ফোরনে পরিণত হয় তাহলে সরকারের জন্য বড় অমঙ্গল বয়ে আনবে। তাই গ্যাস বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সিষ্টেম লস কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহবান জানাচ্ছি। এটা সত্য সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাস বিদ্যুতের দামই সরকার পেয়ে থাকেন। দেশের অধিকাংশ শিল্প কারখানায় অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ রয়েছে যার থেকে পিভিবি, পেট্টোবাংলার উধর্ক্ষতন কর্মকর্তা কর্মচারীরা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছেন। এছাড়া সারা বাংলাদেশে লোড শোডিং ও অবৈধ বিদ্যুতের বড় খাদক হয়ে দাড়িয়েছে বেটারীচালিত রিক্সা ও টমটম। এসব অবৈধ যানবাহনে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তারা। একমাত্র অবৈধ বেটারী চালিত রিক্সা বন্ধ হলেই বিদ্যুতের সাশ্রয় হবে ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি। বাসা বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রেখে অবৈধ বেটারী চালিত রিক্সায় কেন বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে তা এখন আর আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। দেশের স্বার্থে জনগণের কল্যাণে বেটারী চালিত রিক্সা বন্ধে সরকারকে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। এবং যারা রিক্সা চালানোর মতো কঠোর পরিশ্রম ও মানহীন পেশায় নিযুক্ত আছেন তাদের জন্য বিকল্প পেশা তৈরী করতে হবে। আবাসিক খাতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি হলে বাংলাদেশের পরিবেশের ১২ টা বাজবে। কেননা আবাসিক খাতে যদি দু চুলার ১ হাজার টাকা হয়ে যায় তাহলে সিলিন্ডার গ্যাসের বোতল প্রতি ১৫ শত টাকা থেকে ৩ হাজার টাকায় গিয়ে দাঁড়াবে। ফলে মানুষ আর গ্যাস সিলিন্ডার ও গ্যাসের চুলা ব্যবহারের পরিবর্তে লাকরী চালিত চুলা ব্যবহারেই উৎসাহিত হবে সাশ্রয়ের জন্য, যার মধ্যদিয়ে গাছ কাটার উৎসব তৈরী হবে এবং পরিবেশের ১২ টা বাজবে। এমনিতে বাংলাদেশ জলবায়ূ পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্থ দেশের অন্যতম স্থানে অবস্থিত তাই দেশের সার্বিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে মূল্যবৃদ্ধি সিন্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। গ্যাস বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নয় সিষ্টেম লস কমাতে কার্যকর ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে সরকার এটাই জনগণের প্রত্যাশা।

সর্বশেষ সংবাদ