আর কত হত্যা ও লাশের রাজনীতি--কামরুল হাসান বাদল কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 13/10/2014-11:52am:    মনিরের জন্যে একটি শোকগাঁথা লিখব বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু ভাবনাগুলো স্থির করতে পারছিলাম না। পত্রিকায় মনিরের অঙ্গার হওয়া ছবিটি দেখেছি। অদ্ভুত একটি ছবি। শরীরের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে গেছে। হাঁটুজোড়া বুকের কাছে এনে মনির বসে আছে হতভম্বের মতো। তার সারা শরীর ঝলসে গেছে। মনির বুঝতে পারছে না তার কী হয়েছে। সে তো তার বাবার কাভার্ড ভ্যানে ঘুমিয়ে পড়েছিল। গাড়ি চালাচ্ছিল তার বাবা। মনির ভাবছে সে কি কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে। কিছুই তো জানে না সে, বাবার সাথে ঢাকা বেড়াতে বেরিয়েছিল সে। ঘুরতে ঘুরতে গাজীপুর পৌঁছেছিল বাবার সাথে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত বোঝে না মনির। হরতাল বোঝে না। পিকেটিং বোঝে না। বোঝে না এখন পিকেটিংয়ের নামে একদল হায়েনা নেমে আসে জনপদে। নিষ্ঠুর, অতি নির্মমভাবে ওরা ধ্বংসলীলা চালায়। গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে দেয়। নিরীহ, নিরপরাধ,নারী-শিশু, বৃদ্ধ-প্রতিবন্ধী কেউ-ই রেহাই পাচ্ছে না এই হায়েনাদের হাত থেকে। এই হায়েনারা একাত্তরের হায়েনাদের চেয়েও ভয়ংকর ও নিষ্ঠুর। এরা তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে হরতাল আহবান করে। আর সে হরতালের একদিন আগে থেকে শুরু করে এমন প্রাণঘাতি নিষ্ঠুর নির্মম পিকেটিংয়ের নামে বর্বরতা। দুঃখিত আমি মনিরের জন্য কোনো শোকগাঁথা রচনা করতে পারিনি। বরং মনিরের অগ্নিদগ্ধ হয়ে হতভম্বের মতো বসে থাকার দৃশ্যটি মনে আসতেই সব কিছু গুলিয়ে ফেলেছি। চিন্তা এলোমেলো হয়ে যায়। রক্তচাপ বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে এমন ঘটনা, বাড়তে থাকে আগুনে পোড়া মানুষের সংখ্যা, বাড়তে থাকে মৃতের সংখ্যা, বাড়তে থাকে বিলাপ, বাড়তে থাকে স্বজনের আহাজারী, বাড়তে থাকে রক্তচাপ, তারপর হাসপাতাল-ক্লিনিক, পূর্ণ বিশ্রাম আর এই নিষ্ঠুর ও বিভৎস চিত্র ও সংবাদ দেখার ওপর নিষেধাজ্ঞা। তারপরে আমি বিশ্রামে শুয়ে কাটাই। ঘুমের বড়ি খেয়ে ঘুমাই। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করাই। শুয়ে থাকি, ঘুমিয়ে থাকি- কিন্তু মস্তিষ্কের নিউরনে নিউরনে মনির, অবচেতন মনে মনিরের অর্ধদগ্ধ, হতবিহ্বল বসে থাকার, বুক ভেঙে যাওয়া ভঙ্গির ছবিটি ভেঙে দেয় আমার স্বস্তি। অবস করে দিচ্ছে আমার অনুভূতি। আমি দেখতে থাকি, শুনতে থাকি আর্তনাদ, মানুষ পুড়ে যাচ্ছে- তাদের গায়ে পেট্রোল ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। তারা মরে যাচ্ছে। সে ভয়াবহ আগুন থেকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট থেকে একজন-দুজন এভাবে শত শত অসহায় মানুষের বিলাপ আর আর্তনাদ আমি শুনতে পাই। আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমার বিশ্রাম টুটে যায়। আমি এলোমেলো পায়চারি করি মধ্যরাতে। একলা দুপুরে- বিষন্ন বিকেলে- একাকী সন্ধ্যায়। আমি নিজের সামনে দাঁড়াতে পারি না অগ্নিদগ্ধ- নিহত শিশু মনির ঔদ্ধত্যের ভঙ্গিমায় বলে, আমাকে পোড়ালে কেন? তোমাদের আন্দোলনের কী ক্ষতি করেছিলাম। আমিতো বাবার সাথে ঢাকা শহর দেখতে বেরিয়েছিলাম। মনিরকে বলি, মনির শোন, তোমার জন্যে এমন একটি শোকগাঁথা লিখব, যা পড়ে কেউ কোনোদিন আর শিশুহত্যা করবে না এ দেশে। মানুষ মরবে না বিনাদোষে। একাত্তরের ঘাতকদের বাঁচাতে নব্য ঘাতকরা প্রাণ নিতে পারবে কোনো নাগরিকের। কিন্তু না কিছুই হয় না। মনিরদের জন্যে শোকগাঁথা রচিত হয় না। মৃত্যুর মিছিল থেমে থাকে না। বরং এ মিছিল দীর্ঘ হয়। আরও শিশু মনিরের মতো দগ্ধ হয়। পুড়ে যায়, মরে যায়। একসাথে ১২ জন যাত্রীর গায়ে পেট্রোল বোমা ছোড়া হয়। তারা অগ্নিদগ্ধ হয়। হাসপাতালে যায়। হাসপাতালের বাতাস আরও ভারী হয়ে ওঠে। এই হত্যা ও লাশের রাজনীতি বন্ধ হবে কবে। গত ২২ বছরে এ ধরণের রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহাণি ঘটেছে আড়াই হাজার। ২০০১-০৬ বিএনপি শাসনামলে মৃত্যুর সংখ্যা ৯০৮। ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত ৫৪৯ জন। শুধু গত ১০ মাসে নিহতের সংখ্যা ৩০৪ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ নিহত হয়েছে ২০০১ সালে ৫০০ জন। একদিনের হরতালে তৈরি পোশাক শিল্পের ক্ষতি ২০০ কোটি। পরিবহন খাতে ২৫০ কোটি আর ক্ষুদ্র ব্যবসায় ৬০০ কোটি টাকা। তারপরেও হরতাল হতে পারে। যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় হরতাল কর্মসূচি বিদ্যমান। হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার। দ্বিমত নেই। যে দল যত পারে হরতাল ডাকুক। জনগণ যদি সে দলের দাবিকে যৌক্তিক মনে করে তবে তারা হরতালে সংহতি প্রকাশ করবে। নিজেরাও হরতাল পালন করবে। অন্যদিকে সমর্থন না দিলে বা সহমত পোষণ না করলে তারও অধিকার আছে হরতাল পালন না করার। নিজের কাজ করার। তারপরেও অতীতে আমরা পিকেটিং করতে দেখেছি। খুব বেশি হলে টায়ার পাংচার করে দেওয়া। চালকদের কান ধরে ওঠ-বস করা। নেতানেত্রীরা রাস্তায় শুয়ে বসে অবরোধ ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা। এমন সহিংস, নির্মম পিকেটিং আগে কখনও দেখিনি। গত ১৫/১৬ বছর থেকে পিকেটিং ক্রমশ সহিংস হয়ে উঠছিল। তবে গত ডিসেম্বর থেকে বিশেষ করে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই জামায়াত-শিবির এমন সহিংস হয়ে ওঠে। জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর আর নৃশংস উৎসবে মেতে ওঠে ওরা। এমন নিষ্ঠুর আচরণ একটি স্বাধীন দেশে হতে পারে, তা ভাবতেও কুক্তিত হই। রাষ্ট্রীয় সম্পদ, সাধারণ মানুষের গাড়ি-বাড়ি-দোকান প্রতিষ্ঠান কিছুই বাদ যাচ্ছে না এসব আন্দোলনকারী নামের হায়েনাদের কাছ থেকে। বিগত দিনে বিএনপি’র রাজনীতি আমরা দেখেছি। তাদের আন্দোলন-সংগ্রামও প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু এমন নির্মম হতে কখনও তাদের দেখিনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অনেক নেতার চেয়ে কিছু কিছু বিএনপি নেতাকে অনেক বেশি সহনশীল ও সংযম বলে মনে হয়েছে। অনেক যুব ও ছাত্রদল নেতাকর্মীদেরও চিনি, যাদের কখনো এমন নিষ্ঠুর ও নির্মম বলে মনে হয়নি। মনে হয় না বিএনপি বা তার সহযোগী কোনো সংগঠনের কর্মীরা কোনো সংবাদমাধ্যম কর্মীর ওপর আঘাত হানতে পারে। তাদের গায়ে হাত তুলতে পারে। নিষ্ঠুর-নির্মমভাবে নিরপরাধ মানুষকে পুড়িয়ে মারতে পারে। অথচ অন্তত গত একবছর থেকে আমরা তেমন আচরণই দেখতে পাচ্ছি, বিএনপি ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কাছ থেকে। তাই বিস্ময় জাগে এই আন্দোলনের চাবি বা নিয়ন্ত্রণ বিএনপি’র হাতে আছে না কি হাজার হাজার কোটি টাকার খেলায় অন্য কেউ তা নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে যারাই করুক আমার ধারণা এতে আসলে বিরোধীদলের খুব বেশি লাভ হবে না। মানুষ এমন নিষ্ঠুর-নির্মম কর্মকাণ্ড সমর্থন করবে না। এখনতো মিডিয়াকর্মীদের ফোন করে বা এসএমএস এর মাধ্যমে গাড়ি পোড়ানোর দৃশ্য তুলে মিডিয়ায় প্রচার করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছেন। এই চালাকির তথ্যও এখন মানুষ জেনে গেছে। ওপথও এখন বন্ধ হওয়ার পথে। গণপ্রতিরোধ সৃষ্টি হবে এমন গণহত্যার বিরুদ্ধেই। এক একজন মুনিরের হত্যার দায় তাদের নিতেই হবে। বিচার তাদের হতেই হবে। দেশের রাজনীতি থেকে এমন সহিংস কর্মসূচিকে চিরতরে দূর করতে হবে।

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।