ক্ষমতার উত্তাপ ও সিদ্দিকীর বাতচিৎ--কামরুল হাসান বাদল কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 02/10/2014-10:23am:   

অমার্জিত, অশালীন ও বেহুদা কথাবার্তা বলা ক্ষমতাসীনদের একটি ক্রনিক রোগে পরিণত হচ্ছে। বর্তমান ক্ষমতাসীনদের কথা বলছি না শুধু; প্রায় প্রতিটি সরকারের এমন কিছু মন্ত্রী-এমপি থাকেন যারা বেফাঁস ও বেহুদা কথাবার্তা বলে নিজের সাথে দলও সরকারের বারটা বাজিয়ে থাকেন। অবশ্য এ পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশে নয় পার্শ্ববর্তী ভারত ও পাকিস্তানেরও একই অবস্থা। ভারতের এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীতো ধর্ষণের সাথে শিল্পের তুলনা করে রীতিমত হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন। এবং ধর্ষণের জন্যে নারীদের দায়ী করেও বক্তব্য দিয়েছিলেন।
তবে বাংলাদেশে এ পরিস্থিতি প্রবলভাবে বিদ্যমান। আমরা প্রায়ই মন্ত্রী এমপিদের বিতর্কিত কাজ ও কথাবার্তার সংবাদ পাই। শুধু মন্ত্রী-এমপি নন অন্যান্য জনপ্রতিনিধি যেমন উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার, মেয়র, কাউন্সিলররাও এমন ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকেন না। শুধু জনপ্রতিনিধি নন ‘পাবলিক সার্ভেন্ট’ বলে অভিহিত সরকারি কর্মকর্তাদের বেলায়তো আছেই এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যাদের কাছে জনগণ যায় বিচারের প্রত্যাশায় তাদের বেলায়তো পরিস্থিতি মারাত্মক।
এ সমস্যাটি তৈরি হয় একটি মানসিক স্তর থেকে, আর ওই মানসিক স্তরটি তৈরি হয় ক্ষমতার প্রতাপ বা উত্তাপ থেকে। আর যে সমাজ বা রাষ্ট্রে একজন ক্ষমতাবানের কোনো জবাবদিহি থাকে না, অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে তেমন সমাজ বা রাষ্ট্রে এ প্রবণতা বেশি। ক্ষমতার উত্তাপ অনেককে দুর্বিনীত, উদ্ধত ও অমার্জিত করে তোলে। এ উত্তাপ সহ্য করা ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করার সুযোগ সংবরণ করা সকলের পক্ষে সম্ভব হয় না।
এতসব বেহুদা পেঁচাল বয়ান করতে হলো বর্তমান মন্ত্রিসভার প্রবীণ সদস্য ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর কিছু মন্তব্য নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করতে। নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় রবিবার বিকেলে আমেরিকা প্রবাসী টাঙ্গাইলবাসীদের সাথে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে মন্ত্রী সাহেব এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা নিয়ে সারাদেশেতো বটে, দেশের বাইরে বাঙালি কমিউনিটিগুলোতে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে হাজার হাজার পোস্ট ও কমেন্ট করা হচ্ছে। লতিফ সিদ্দিকী কী বলেছেন তা আর তুলে ধরার প্রয়োজন হচ্ছে না, কারণ গণমাধ্যমের কল্যাণে ইতিমধ্যে পাঠকরা তা জেনে গেছেন।
তার এ ধরনের আচরণ নতুন নয়। ক্ষমতার উত্তাপজনিত ভাইরাসে তিনি আক্রান্ত হয়েছে বেশ আগে। গত সরকারের আমলে পাটমন্ত্রী থাকাকালে তিনি একটি অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে নিয়ে বেশ আপত্তিজনক মন্তব্য করেছিলেন। সে অনুষ্ঠানে মুহিত সাহেব প্রধান অতিথি, তিনি বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তাকে বিশেষ অতিথি করার ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে মুহিত সাহেবকেও তিনি আক্রমণ করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। এ ছাড়া তার প্রায় অর্ধশতাধিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও মন্তব্য আছে তা আজকের আলোচনার বিষয় নয়। শুধু নিউইয়র্কের বক্তব্যের মধ্যেই সীমিত রাখব আজ।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তাই আমি মনে করি একজন মানুষের যেমন ধর্ম পালনের স্বাধীনতা আছে ঠিক তেমনি ধর্ম পালন না করারও স্বাধীনতা আছে। একজন অপরজনের ওপর যেমন জোর করে তার ধর্ম বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে পারেন না তেমনি কেউ অন্যের ধর্ম বিশ্বাসের ওপর আঘাতও করতে পারেন না, অপমান করতে পারেন না। এটি একজন সভ্য, ভব্য ও আধুনিক মনস্ক মানুষের জীবনবোধ, আচরণ। যার যা ইচ্ছা তা বলা বাক স্বাধীনতার পর্যায়ে পড়ে বলে মনে করি না। আর এ ক্ষেত্রে বক্তা যদি হন বিশিষ্ট কেউ, তাহলে তাকে আরও সতর্ক থাকতে হবে মন্তব্য করার সময়ে। আবদুল লতিফ সিদ্দিকী মন্ত্রী থাকা অবস্থায় যা করেন, বলেন- তার দায়-যে সরকার বা তার দলকেও বহন করতে হবে-এ সাধারণ জ্ঞানটুকু লতিফ সাহেবের নেই তা- কষ্ট কল্পনা। নিউ ইয়র্কের সে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি বিনা কারণে হজ ও বিশ্ব এজতেমা নিয়ে বিষোদগার করেছেন। বিষোদগারই শুধু নয় হজ সম্পর্কে ভুল ও বানোয়াট তথ্য দিয়েছেন। এবং একজন ধর্ম প্রচারক লতিফ সাহেব নিজেই যাঁর ধর্মের অনুসারী এবং মুসলমানদের কাছে আল্লাহর পরে যাঁর স্থান তাঁর নামটিও ভীষণ তাচ্ছিল্যের সাথে উচ্চারণ করেছেন। কাণ্ডজ্ঞানহীন লতিফ সাহেব ভুলে গিয়েছিলেন বিশ্বের প্রায় দেড় শত কোটি মানুষ সে ধর্মের অনুসারী। তাদের কাছে হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর স্থান অত্যন্ত পবিত্রতম উচ্চতায়। কয়েক বছর আগে লতিফ সাহেব একটি প্রকাশনা সংস্থা খুলেছেন। এর সুবাদে হয়ত কিছু লেখক-বুদ্ধিজীবীর সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তাতেই বোধহয় তিনি নিজেকে একজন বোদ্ধা ভাবতে শুরু করেছেন। তাঁর যে জ্ঞান সীমিত তার প্রমাণ হচ্ছে হজ সম্পর্কে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সত্যি নয়। প্রকৃত তথ্যটি তিনি জানেন না। ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে জ্ঞান দিতে গেলে যা হয়।
হজ মূলত প্রাক ইসলামী একটি আচার। বলা যেতে পারে এটি ইসলাম ধর্ম ‘অ্যাডপ্ট’ করেছে। হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর ইসলাম প্রচারের আগেও এ কাবাগৃহকে কেন্দ্র করে হজ বা হজের মতোই একটি মেলা বা অনুষ্ঠান হতো। আরবের অনেক স্থান থেকে মানুষ একটি নির্দিষ্ট দিনে এখানে জড়ো হতো। ইসলাম ধর্ম মতে প্রথম হযরত ইব্রাহিম (আ.) হজের কথা বলেন এবং প্রচলন করেন সৃষ্টিকর্তার নির্দেশে। হজের সময় সাফা-মারওয়া দু’পাহাড়ের মধ্যে যে হাজিদের হাঁটতে হয় তা ইব্রাহিম (আ.) এর স্ত্রী বিবি হাজেরা ও তাঁর সন্তান ইসমাইল (আ.) কে সম্মান ও স্মরণ করে। কারণ হজের সময় হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে মক্কার একটু দূরে রেখে এসেছিলেন, আর এ সময় নিরুপায় বিবি হাজেরা সাহায্যের আশায় এ দুটি পাহাড়ের মধ্যে ছোটাছুটি করেছিলেন। হাজিরা যে আরাফাতের ময়দানে যান তার কারণ হলো পৃথিবীতে পাঠানোর পর আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া (আ.) এই আরাফাতের ময়দানে মিলিত হয়েছিলেন। অর্থাৎ ইসলাম ধর্মে প্রাক ইসলামী যুগের যে বিষয়গুলো কে ধারণ ও গ্রহণ করে নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে হজ অন্যতম। হজ মুসলমানদের পাঁচ ফরজের একটি। কাজেই লতিফ সাহেবের কথা মতো ‘আবদুল্লাহর পুত্র মোহাম্মদ (তার ভাষায়) ভাইব্বা দেখলেন এই আরবরা চলব কেমনে তাই তিনি হজ চালু করেন যাতে বিদেশিরা সেইখানে যায় আর আরবিগো ইনকামের রাস্তা হয় (হুবহু নয়) সত্য নয়। এ তথ্য তার অজ্ঞান প্রসূত।
সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়েও তিনি বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন। একজন সিনিয়র মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও কি তিনি জানেন না যে, জয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা। তিনি ওই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে কি প্রধানমন্ত্রী নিয়োজিত উপদেষ্টাকে উপেক্ষা বা অস্বীকার করতে চান? তিনি, অর্থাৎ লতিফ সাহেব এমন একটি সময়ে এ ধরনের মন্তব্য করলেন যখন প্রধানমন্ত্রী আমেরিকায় তাঁর এবং তাঁর সরকারের ভাবমূর্তি বৃদ্ধির আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন এবং যেখানে তিনি একজন দক্ষ রাজনীতিক ও সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে কর্ম তৎপরতা চালাচ্ছিলেন এবং এ বিষয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মি. নরেন্দ্র মোদির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র নেতাদের প্রশংসাও অর্জন করছিলেন। শেখ হাসিনা যে একজন দক্ষ রাজনীতিক ও সফল রাষ্ট্রনায়ক তা ইতিমধ্যেই বিশ্ব রাজনীতিতে আলোচিত ও স্বীকার্ষ। পরস্পর বিরোধী শক্তি চীন-জাপান-ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে রাশিয়ার সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করে ইতিমধ্যেই তিনি যে কূটনৈতিক সফলতার পরিচয় দিয়েছেন তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে আমরা সন্দেহ পোষণ করি শেখ হাসিনার সকল প্রচেষ্টাই ব্যাহত হবে যদি না তিনি তাঁর সরকারের বাকচটুল, ধূর্ত, অসৎ ও বিশ্বাসঘাতক মন্ত্রী-এমপি ও দলীয় নেতাদের চিহ্নিত না করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন।
একই অনুষ্ঠানে লতিফ সাহেব সাংবাদিক ও টেলিভিশনের টক শোতে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে ঢালাও ও আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন যা অত্যন্ত গর্হিত, নিন্দনীয় ও আপত্তিকর। মন্ত্রী মহোদয় ভুলে যান কেন যে, টক শোতে শুধু সরকার বিরোধীরা যায় না, সরকারের সমর্থকরাও গিয়ে থাকেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা উত্তরাধিকার সূত্রে শুধু যে বঙ্গবন্ধুর দলের হাল ধরেছেন তা-ই নয়, উত্তরাধীকার সূত্রে খন্দকার লতিফ সিদ্দিকীদেরও পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন আশ্চর্যতম উচ্চতায়। তাই তিনি তাঁর দলের চাটুকারদের ব্যাপারে নির্দ্ধিদায় বলতে পারতেন, ‘মানুষ পায় সোনার খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি।’ ‘চাটার দল সব চেটেপুটে খেয়ে ফেলছে’ ইত্যাদি। আওয়ামী লীগে এমন ব্যক্তির কমতি নেই। যারা নিজেরাই দলকে ডুবিয়ে দিতে যথেষ্ট। আওয়ামী লীগের জন্মলগ্ন থেকে দেখেছি এই দলটির ক্ষতি সাধনের জন্যে অন্য দলের প্রয়োজন হয়নি, নিজেরাই যা করার করে দিয়েছে। কাজেই শেখ হাসিনার উচিত হবে এমন ব্যক্তিদের ব্যাপারে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। যে ব্যক্তি প্রথম মন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই নিয়মনীতিকে উপেক্ষা করেছেন। গত পাঁচ ও বর্তমান পৌনে এক বছর মন্ত্রী থাকাকালীন অন্তত অর্ধ শতাধিক অনিয়ম করেছেন, তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। শুধু লতিফ সিদ্দিকী নন, তাঁর মতো বা সমাজ কল্যাণমন্ত্রী মহসীন আলীদের মতো ক্ষমতার উত্তাপজনিত রোগে আক্রান্তদের শুধু সতর্ক নয়, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
বাধ্য হয়ে পুনরুল্লেখ করতে চাই যে, শুধু এবং শুধুমাত্র সুশাসনই শেখ হাসিনার বর্তমান শাসনকালকে পূর্ণ মেয়াদ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখবে।

সর্বশেষ সংবাদ