১৯৭১ ভেতরে বাইরে- একটি ব্যবচ্ছেদ--কামরুল হাসান বাদল

পোস্ট করা হয়েছে 18/09/2014-11:15am:    কামরুল হাসান বাদল জনাব এ. কে. খন্দকার তাঁর বইয়ের ৪২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) গ্রেপ্তারের কথা জানতে পেরে আমার মধ্যে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয় যে, বঙ্গবন্ধু কেন এই রকমের ভুল করলেন, যা তিনি সহজেই এড়িয়ে যেতে পারতেন। পরবর্তী সময়ে এই কথাটি আমাকে খুব পীড়া দিত যে, এই ভুল না হলে মুক্তিযুদ্ধে আমরা আরও ভালো করতে পারতাম। হয়ত অনেক মানুষকে জীবন দিতে হতো না বা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হতো না। তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন অথচ গ্রেপ্তারের আগে কোনো আদেশ নির্দেশ বা উপদেশ দেন নি এবং পরিষ্কারভাবে আমাদের ভবিষ্যতের করণীয় সম্পর্কে কিছু বলেন নি। তাঁর আদেশ বা নির্দেশের অভাবে হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। আমি মনে করি, নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্য বঙ্গবন্ধুর যথেষ্ট সুযোগ ছিল এবং গোপনে থেকে তিনি যুদ্ধে দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দিতে পারতেন। জাতির জনকের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে খন্দকার সাহেব চরম ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন বলে অন্তত আমার কাছে মনে হয়। কারণ তাঁর বইয়ের বিশাল একটি অঙ্গ জুড়ে তিনি বার বার এই একটি ব্যাপারকেই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করার চেষ্টা করেছেন যে, রাজনীতিবিদদের অদূরদর্শিতা- পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধুর কারণে মুক্তিযুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। শুধু তাই নয়, নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বারবার রাজনীতিবিদদের খাটো করার অপচেষ্টা করেছেন। তিনি অনেক স্থানে উল্লেখ করেছেন বঙ্গবন্ধুর কোনো যুদ্ধ প্রস্তুতি ছিল না। অথচ তিনিই মুজিব বাহিনীর বিষয়ে লিখতে গিয়ে একস্থানে লিখেছেন, ‘ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি বা কোনো মাধ্যম দিয়ে আগে থেকেই বঙ্গবন্ধুর একটা যোগাযোগ হয়েছিল বলে মনে হয়। এ কথাটি এজন্য বলছি যে, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হওয়া ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগেই মুজিব বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র পেতে শুরু করে। জুলাই মাস থেকে মুজিব বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ শেষে সীমান্ত এলাকায় বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাদের কর্মকাণ্ড শুরু করে। এই খন্দকার সাহেবই তার বইয়ের ৫২ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন, অসহযোগ আন্দোলনে রাজনৈতিক নেতারা মোটামুটি সফল হয়েছিলেন বটে কিন্তু প্রতিরোধ যুদ্ধ তথা মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্বের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় দূরদৃষ্টি দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। যার জন্য আমাদের অনেক উচ্চমূল্য দিতে হয়েছিল।’ কী বৈপরীত্য! নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে খন্দকার সাহেব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি এই বই লিখতে গিয়ে বার বার ভুলে গিয়েছিলেন যে, তিনি একটি জনযুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যে যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছিল রাজনৈতিক নেতাদের নেতৃত্বেই। রাজনৈতিক নেতাদের কৃপা, সুপারিশ ও আগ্রহ না থাকলে, তিনি ভারতে প্রবেশ করাতো দূরের কথা মুক্তিযুদ্ধেই অংশ নিতে পারতেন না। কারণ ভারত জেনারেল ওসমানি, খন্দকার, জিয়া, খালেদ মোশাররফ, তাহেরদের মতো সামরিক বাহিনীর লোকদের বিশ্বাস করেছে, আশ্রয় দিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার বিষয়টি মেনে নিয়েছে তৎকালীন প্রবাসী সরকারের অনুমোদনে যে সরকার ছিল বেসামরিক ও জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। আমি ভীষণ অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছি সমগ্র বই জুড়ে তিনি সামরিক বেসামরিক প্রায় সকলের সমালোচনা করেছেন একমাত্র নিজেরও মরহুম তাজউদ্দিন সাহেব ছাড়া। এমনকি খন্দকার সাহেব যুদ্ধকালীন জেনারেল ওসমানীর ভূমিকা নিয়ে যেভাবে লিখেছেন তাতে যে কারও মনে হবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানি ছিলেন অকর্মণ্য, অযোগ্য। পুরো যুদ্ধটি পরিচালিত হয়েছে খন্দকার সাহেবের একক যোগ্যতা ও প্রচেষ্টায়। যে ব্যক্তিটি জনগণের মুক্তির জন্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো জেলে কাটিয়েছেন, একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ভেঙে, যে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেই লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান োগানে সোচ্চার ছিলেন, একটি উদার গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন। যিনি প্রথম একটি মুসলিম প্রধান দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ করে তুলেছিলেন যিনি বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যিনি একটি ভাষা ও জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন খন্দকার সাহেব তাঁকেই,তাঁর নেতৃত্বকেই বার বার প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন সচেতনভাবে। নইলে কেন তিনি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করবেন। ৭ মার্চের ভাষণ এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা দুটোই ঐতিহাসিক ও সংবিধান এমনকি বিশ্ব স্বীকৃত বিষয়। তিনি কেন ও কোন উদ্দেশ্যে এই দুটি প্রশ্ন উত্থাপন করলেন। শুধু তাই নয়, তিনি এমন সময়ে এই কুবিতর্ক উসকে দিলেন যখন তারেক জিয়া লন্ডনে অবস্থান করে বিভিন্ন বক্তৃতা বিবৃতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের মীমাংসিত ও মৌলিক বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তাই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন এই বই লেখা এবং তা এই সময়ে প্রকাশ কি শুধু কাকতালীয় বিষয় না কি এতে কোনো উদ্দেশ্য কাজ করছে। সে উদ্দেশ্যটি কী? গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আমরা দেখেছি বাংলাদেশের সুশীল শ্রেণি ও সামরিক বাহিনীর একটি অংশ রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার অনেক পরিকল্পনা করেছিলেন। অনেকে নিজের পত্রিকায় তা নিয়ে স্বনামে কলামও লিখেছিলেন কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছেন। আমার ধারণা ওই শক্তি বা গোষ্ঠীটিই এবার মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের অবদানকে মাইনাস করার নতুন আরেকটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন এবং তার অংশ হিসেবেই ওই বইয়ের পরতে পরতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও যুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকার ও রাজনীতিকগণের ভূমিকায় তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। খন্দকার সাহেব লিখেছেন, ‘২৫ মার্চ যদি বঙ্গবন্ধু পালিয়ে যেতেন-’ স্বাধীনতার পরে দেশি বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার প্রদানকালে বঙ্গবন্ধু সে রাতে তাঁর সিদ্ধান্তের কারণটি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বহুবার বলেছেন তিনি যদি পালিয়ে যেতেন তাহলে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গ্রেপ্তারের অজুহাতে অসংখ্য জায়গায় গণহত্যা চালাত এবং বঙ্গবন্ধুকে পেলে তাঁকে হত্যা করে ‘পালিয়ে যাওয়ার সময়ে ক্রসফায়ারে নিহত’ বলে প্রচার করার সুযোগ পেত। আমি মনে করি সেদিন যদি বঙ্গবন্ধু পালাতেন তবে তা-ই ঘটতো এবং শুধু তাই নয় এই খন্দকার সাহেবদের মতোই অনেকে বলতেন যে, জাতিকে নিরস্ত্র অবস্থায় পাকিস্তানিদের মুখে ফেলে রেখে তিনি ভীতু কাপুরুষের মতো পালিয়েছেন। তাঁরাই বলত মাত্র এক কোটি মানুষইতো ভারতে আশ্রয় নিয়েছে বাকি সাড়ে ছয় কোটি মানুষকে নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে তিনি ভারতে আশ্রয় নিলেন কী করে। পালানোর মতো নেতা যে বঙ্গবন্ধু নন তার একটি প্রমাণ পাঠকদের সামনে তুলে ধরছিণ্ড ১৯৩৮ সালে গোপালগঞ্জ শহরে হিন্দু মুসলিম দাঙা হয়েছিল। দু’পক্ষেই বেশ হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে থানায় মামলা হলে পুলিশ তখন অনেককে গ্রেপ্তার করে। বঙ্গবন্ধু তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন যা তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে- সকাল নটায় খবর পেলাম আমার মামা ও আরও অনেককে গ্রেপ্তার করে ফেলেছে আমাদের বাড়িতে কি করে আসবে থানার দারোগা সাহেবদের একটু লজ্জা করছিল। প্রায় দশটার সময় টাউন হল মাঠের ভিতরে দাঁড়িয়ে দারোগা আলাপ করছে, তার উদ্দেশ্য হল আমি যেন সরে যাই। টাউন হলের মাঠের পাশেই আমার বাড়ি। আমার ফুফাতো ভাই, মাদারিপুর বাড়ি। আব্বার কাছে থেকেই লেখাপড়া করতো, সে আমাকে বলে, মিয়া ভাই পাশের বাসায় একটু সরে যাও না’। বললাম, যাব না, আমি পালাব না। লোকে বলবে আমি ভয় পেয়েছি। এই হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। আর ২৫ মার্চের বঙ্গবন্ধুর না পালানোর বিষয়ে ফিরিস্তি দিচ্ছেন একজন বেতনভুক্ত সরকারি কর্মকর্তা যিনি জীবনে কখনো বঙ্গবন্ধুর সাথে পাঁচ মিনিট কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন কিনা জানি না। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট স্টেনগান তাক করা অবস্থায়ও সামান্য বিচলিত হন নি। হাত কাঁপে নি, চিরাচরিত অভ্যাসমতো হাতে পাইপধরা অবস্থায় ঘাতকদের ধমক দিয়েছেন যাঁকে ঘাতকরা পিঠে গুলি করতে পারে নি- তাঁর দূরদর্শিতা, দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আকাঙক্ষা নিয়ে খন্দকার সাহেব প্রশ্ন ও বিতর্ক উত্থাপন করেছেন। জয় পাকিস্তান তত্ত্বের উদ্ভাবক জনাব এ কে খন্দকার সামরিক উর্দি পরা হয়ে গণমানুষের ভাবাবেগ, ভালোবাসা আর তাদের নেতৃত্ব নিয়ে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন। তাই তিনি নয় মাস শুধু বেসামরিক সরকার তথা প্রবাসী সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতাদের ছিদ্রান্বেষণের চেষ্টা করেছেন। খন্দকার সাহেব যে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়েই অজ্ঞ ছিলেন তা নয়, মুক্তিযুদ্ধের উপঅধিনায়ক হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ব রাজনীতির কোনো খবরও জানতেন না বলে মনে হয়। তাঁর বইয়ের ৯৯ পৃষ্ঠায় তিনি যুদ্ধে ভারত সরকারের সমালোচনা করে লিখেছেন, বিএসএফ পর্যাপ্ত অস্ত্র সরবরাহ না করার কারণ তাদের হয়ত অস্ত্র ছিল না অথবা তারা সরকারের অনুমতি পায় নি। আমার মনে হয়েছিল ভারতীয়রা প্রথমদিকে যুদ্ধটি শুধু টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। কোনো কিছু অর্জন করতে চায় নি। তখন পর্যন্ত ভারতীয়দের সহযোগিতার কথা বলতে গেলে বলব, তারা সীমান্তে কতগুলো সামরিক ঘাঁটি তৈরি, মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু লজিস্টিক সহায়তা ও কিছু হালকা অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করার অতিরিক্ত বিশেষ কিছু করে নি।’ মুক্তিযুদ্ধের সামান্যতম ইতিহাস যারা জানেন তাদের কাছেও বিষয়টি পরিষ্কার থাকলেও উপ-সেনাপতির কাছে বিষয়টির কোনো ব্যাখ্যা নেই আসলে বাস্তবতাটি ছিল সেদিন। ভারতে তখন শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় এক কোটি মানুষ। তাদের খাওয়া, পরা, আশ্রয়, চিকিৎসা, ওষুধ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ আর প্রবাসী সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে নানাবিধ সাহায্য প্রদান ওসময়ে ভারতের অর্থনীতির ওপর ভীষণ চাপ সৃষ্টি করেছিল। এছাড়া ছিল বিশ্ব রাজনীতির চাপ। পূর্বের সকল দৃষ্টান্ত পাল্টে দিয়ে বিশ্ব রাজনীতির দুই মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তানের পক্ষে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কারণে ইউরোপ ও অন্যান্য মহাদেশের প্রভাবশালী দেশ, মধ্যপ্রাচ্য তখন পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল। ওই সময়ে ভারতের জন্য তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন ছিল অত্যন্ত জরুরি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী তখন বাংলাদেশের প্রতি বিশ্ব জনমত তৈরির জন্যে বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন এবং একটি পর্যায়ে অর্থাৎ জুনের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ভারতে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ভারতের অবস্থান শক্তিশালী হয় এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সাহায্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এ কথাগুলো খন্দকার সাহেবের গ্রন্থে বিস্তৃতভাবে আসা উচিত ছিল এবং এই যুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধী ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অবদানের কথা একটু কৃতজ্ঞতার সাথে উচ্চারণের প্রয়োজন ছিল। তিনি তাঁর বইতে আগাগোড়া রাজনীতিকদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। অনেকের ত্রুটির কথা উল্লেখ করলেও নিজের কোনো ভুলত্রুটি হয়েছে বলে মনে করেন নি। আমি ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নই। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি, প্রবাসী সরকারের ভূমিকা, মুজিব বাহিনী ইত্যাদি নিয়ে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। যারা জড়িত ছিলেন তাঁরা তার অসংলগ্নতা বা তাঁর লেখায় অনিয়ম ও বিকৃতি কিছু থাকলে তা তারা প্রতিবাদ করবেন আমি শুধু তাঁর বইতে পরস্পর বিরোধী ও জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্যের বিকৃতির বিরুদ্ধে বলেছি এবং তা খণ্ডন করার চেষ্টা করেছি। একজন উপ সেনাপতি হিসেবে তাঁর এ গ্রন্থ অন্যভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে, কারণ তাঁর মতো এত কাছে থেকে দেখা অন্য কারোর কোনো গ্রন্থ আমরা এখনও পাই নি। এই বইয়ের সত্যমিথ্যা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনা সমালোচনা হবে। আমিও লেখাটি শেষ করব তাঁরই বইয়ের বর্ণনা তুলে দিয়ে। কারণ সারা বইতে তিনি অন্যদের অর্থাৎ বেসামরিক ও প্রবাসী সরকারের সমালোচনা করেছেন কিন্তু তাঁরা দু’সেনাপতি সামরিক বাহিনীর অফিসার হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের কাজের নমুনা, কর্তব্যনিষ্ঠা, দূরদর্শিতা ও শৃঙ্খলার একটি নমুনা তুলে ধরছি। তার বইয়ে দেওয়া তথ্যসূত্রে ৬ ডিসেম্বর সকালে ভুটান ও বিকেলে ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। . . . ৭ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ডা. আবদুল মোত্তালিব মানিক যুদ্ধবিরতির জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে একটি আবেদন করেন। ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশের বিভিন্নস্থানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। . . . ১৪ ডিসেম্বর বিকেল চারটায় ভারতীয় বিমানবাহিনী গভর্নর হাউসে (বর্তমান বঙ্গভবন) অনুষ্ঠিত মন্ত্রী পরিষদের সভায় আক্রমণ করে। গভর্নর মালিক ভীত হয়ে তৎকালীন হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে গিয়ে রেডক্রসের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ উদ্ধৃতিগুলো খন্দকার সাহেবের। তার মানে তাঁর লেখার মধ্যেও আমরা পাঠকরা আন্দাজ করতে পারি যে, বিজয় আমাদের আসন্ন। কারণ এরই মধ্যে মিত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর সকাল ১০টার মধ্যে। এ ধরনের টান টান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে আমাদের দু’সেনাপতি- প্রধান সেনাপতি এম. এ. জি. ওসমানি ও উপ-প্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার কেমন তৎপর, বিচক্ষণ, কর্তব্যনিষ্ঠ ও সুশৃঙ্খল ছিলেন তার একটি নমুনা খন্দকার সাহেবের বই থেকেই তুলে দিচ্ছি। খন্দকার সাহেব তার বইতে যেখানে রাজনৈতিক নেতা তাদের যুদ্ধ পরিচালনা, সরকার ব্যবস্থা ও নেতৃত্ব নিয়ে বারংবার সমালোচনা করেছেন সেখানে তাঁরা দু’জন সামরিক বাহিনী সুশৃঙ্খল অফিসার ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও কী করেছেন দেখুন- তাঁর লেখনীতে- ভারতীয় সামরিক বাহিনীর লিয়াজোঁ অফিসার কর্নেল পি দাস অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর ব্যক্তিগত সচিব ফারুক আজিম খানের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে অনুষ্ঠেয় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর জানান। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ বাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানির খোঁজ করতে গিয়ে জানতে পারেন যে, কর্নেল ওসমানির মুক্ত এলাকা পরিদর্শনে সিলেটে গেছেন। এ হচ্ছে প্রধান সেনাপতির কাণ্ড। এবার উপপ্রধান কী করছেন দেখুন কর্নেল ওসমানির অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বিকেল চারটায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমি বাংলাদেশ বাহিনীর পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করব। এ সময় আমি সম্ভবত কমল সিদ্দিকীসহ কয়েকজন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে দেখার জন্য গিয়েছিলাম, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমার যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ড. ফারুক আজিজ খান এবং প্রধানমন্ত্রীর মিলিটারি লিয়াজোঁ অফিসার মেজর নুরুল ইসলাম আমাকে চারদিকে খুঁজতে শুরু করেন’। ‘. . . সে সময় আমার পরনে বেসামরিক পোশাক, অর্থাৎ একটি শার্ট আর সোয়েটার ছিল। আমি এগুলো বদলে সামরিক পোশাক পরারও সময় পেলাম না। তাঁরা আমাকে বিমান বন্দরে পৌঁছে দেন সেখানে গিয়ে দেখি যে, একটি সামরিক যাত্রীবাহী বিমান দাঁড়ানো আছে’। যখন বাংলাদেশের অনেক এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে যখন পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ শুধু সময়ের ব্যাপার তখন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ও উপপ্রধান সেনাপতির ভূমিকা দেখে এবং বর্তমানে জনাব এ কে খন্দকারের অবস্থান দেখে ভাবছি বাংলায় সেনাপতি পলাশী থেকে রেসকোর্স নামে আরও একটি লেখা লিখতে হবে আমাকে। E-Mail : [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ