১৯৭১ ভেতরে বাইরে একটি ব্যবচ্ছেদ--কামরুল হাসান বাদল কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 11/09/2014-08:32pm:    - গত কয়েকদিন ধরে দেশ জুড়ে আলোচিত-সমালোচিত ও নন্দিত-নিন্দিত হচ্ছে একটি বই। মুক্তিযুদ্ধের উপ অধিনায়ক বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান, সাবেক মন্ত্রী ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সভাপতি এ কে খন্দকারের লেখা ‘১৯৭১ ভেতরে বাইরে’ প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে তা নিয়ে বিতর্ক ওঠে। জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে গ্রামের চায়ের দোকান পর্যন্ত সবখানে আলোচনার বিষয় এখন একে খন্দকার ও তার বিতর্কিত বইটি। এ কে খন্দকার বেশ ভদ্র সজ্জন। মিতবাস এবং কর্মঠও বটে। কারণ ১৯৫১ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ক্যাডেট পাইলট হিসেবে চাকরিতে ঢোকার দীর্ঘ বছর পর এ বছরের জানুয়ারি মাসে শেখ হাসিনার অধীনে নতুন সরকার গঠিত হলে সেখানে তাঁর ঠাঁই না হওয়ায় প্রথম বার চাকরিবিহীন, বেকার অথবা অবসর গ্রহণ করলেন। ১৯৫১ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগদানের পর দীর্ঘ ১৮ বছর পর ১৯৬৯ সালে তিনি বাংলাদেশ থেকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি হয়ে আসেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধের সহ-অধিনায়ক স্বাধীনতার পর বিমান বাহিনীর প্রধান, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মোস্তাক সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদান। পরে চাকরিচ্যুত হয়ে তাঁর বইতে তিনি লিখেছেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগ করেন বা পদত্যাগে বাধ্য হয়ে সে সরকারের অধীনে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। এরপরে ভারতের রাষ্ট্রদূত, তারপরে এরশাদের পতন হওয়া পর্যন্ত তাঁর মন্ত্রীসভায় পরিকল্পনা মন্ত্রী এবং তার পরে আওয়ামীলীগের সাংসদ, পরে পরিকল্পনা মন্ত্রী। অর্থাৎ স্বাধীনতার পর প্রতিটি সরকারের আমলেই তিনি ক্ষমতা ও তার সুফল ভোগ করেছেন। যে লোকটি ১৯৫১ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত এ দেশে থাকেননি। যিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬ ছয় দফা আন্দোলন, এমনকি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানও ভালো করে দেখেননি বা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। যিনি বাঙালির এই দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসকে প্রত্যক্ষ করেননি অংশগ্রহণ করেননি এমনকি পত্র-পত্রিকায়ও ভালো করে পড়েননি (তিনি তাঁর বইতে উল্লেখ করেছেন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের পত্র-পত্রিকায় বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রামের কথা লেখা হতো না বলে এদেশের অনেক কিছুই তাঁর পক্ষে জানা তখন সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি) তিনি যখন মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ এবং তার নায়কদের বিষয়ে লিখতে যান তখন তা খন্ডিত, বিকৃত আরোপিত ও ভ্রান্ত হতে বাধ্য। তা-না হলে নির্বাচন থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত এবং তার লেখায় বহুবার উল্লেখিত সে সময় নিয়ে রাজনীতিবিদদের প্রসঙ্গে যে আপত্তিকর বিভ্রান্তিমূলক ও অপমানজনক মন্তব্য করেছেন তা উদ্ভাবিত হতো না। ১৯৫১ থেকে যাঁর জীবন কেটেছে সশস্ত্র বাহিনীর অত্যন্ত কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে তিনি কীভাবে গণমানুষের রাজনীতি তাদের আবেগ-উত্তেজনা তাদের নেতাদের প্রতি অকৃত্রিম ও বাঁধভাঙ্গা ভালোবাসার মূল্যায়ন করবেন। তিনি সামরিক বাহিনীর লোক কাজেই বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস ও তার পথ পরিক্রমায় একজন সামরিক ব্যক্তির দৃষ্টিতে দেখতে গিয়ে বারবার আন্দোলন সংগ্রামকে এক প্রকার সামঞ্জস্যহীন, অগোছানো, শৃঙ্খলাহীন ও নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা হিসেবে দেখেছেন এবং তাঁর বইতে তা বারবার উল্লেখ করেছেন। বাঙালি হাজার বছরের ইতিহাসে ১৯৭১ সাল একটি উল্লেখযোগ্য ও গৌরবের কাল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠদলের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার । অন্যদিকে ১৯৪৭ সালের পর প্রথমবারের মতো বাঙালির অবিসংবাদিত নেতাকে তাঁর ৬ দফার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ না দিতে পশ্চিম পাকিস্তানি তথা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর নানাবিধ ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধু তখন একটি নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের প্রধান। নির্বাচনে বিজয়ী এক নেতা। নিয়ম অনুসারে প্রেসিডেন্ট তাঁর দলকেই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে ডাকবেন। তখন তিনি কোনো বিপ্লবী দলের প্রধান নন এবং দেশে বিপ্লবের মাধ্যমেও সরকার বদল হচ্ছে না। সে কারণে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক সংসদ অধিবেশন আহবান না করা পর্যন্ত কার্যত বঙ্গবন্ধু কোনো কিছুই করতে পারেন না। শেষে ২৫ তারিখ অধিবেশন ডাকা হবে বলে ইয়াহিয়া আলোচনার আহবান জানালেন। একজন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত নেতা হিসেবে সে আলোচনার আহবানকে উপেক্ষা করে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা দিলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে চিহ্নিত হতেন এবং যে কারণে বাংলাদেশের সে যুদ্ধে বিশ্ব জনমত এমনকি ভারতের সমর্থন আদায়ও সম্ভব হয়ে উঠতো না। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারত হস্তক্ষেপ করছে বলে এই যুদ্ধে ভারতের ভূমিকাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারত পাকিস্তান। যে কারণে পাকিস্তানিদের দ্বারা আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত স্বাধীনতা ঘোষণা না করার কৌশল গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং ইতিহাস সাক্ষী তিনি তাতে সফল হয়েছিলেন। কিছু মাথামোটা ও হঠকারী ছাত্র যুব ও আওয়ামীলীগ নেতার উস্কানি সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সে সময়কে মোকাবেলা করেছিলেন। সম্ভবত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক ছিলেন তিনি। আন্দোলন সংগ্রামে অভিজ্ঞতাহীন ও জনগণের সাথে সম্পর্কহীন বাহিনীর ছাউনিতে বসবাসকারী একে খন্দকার সে সময়ে রাজনৈতিক দল ও তার নেতাদের ব্যর্থতা ও দূরদর্শিতাকে সমালোচনা করে লিখেছেন ‘আমি পাকিস্তানিদের তটস্ত রাখা ও তাদের পদ্ধতি ব্যাহত করার পরিকল্পনাগুলো উইং কমান্ডার এম আর মীর্জাকে জানিয়েছিলাম। আমার এসব কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, দুই দিনের আন্দোলনে যুদ্ধ জয় করা সম্ভব নয়। বিজয়ের জন্য যথেষ্ট পূর্ব প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। আমাদের উচিত ছিল, পাকিস্তানিরা পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই ছোট ছোট আঘাত আর খোঁচার মাধ্যমে তাদের নাজেহাল করা।’ আরেক জায়গায় লিখেছেন সারাদেশে এ ধরনের ছোট ছোট তৎপরতা চালিয়ে পাকিস্তানিদের দৌড়ের ওপর রাখা যেত। কী বালখিল্য মূল্যায়ন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবানের তারিখ থাকা এবং তা নিয়ে আলোচনাকালে এমন তৎপরতা ও আক্রমণ বিচ্ছিন্নতাবাদী ও অন্তর্ঘাতমূলক হতো না তখন। রাজনৈতিক এই বিচক্ষনতা তাঁর মতো একজন পাকিস্তানের ‘মোস্ট অবিডিয়েন্ট’ এর পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না তখন। তিনি তাঁর লেখায় বারবার বঙ্গবন্ধুকে দোষারোপ করেছেন স্বাধীনতা ঘোষণা, তার পূর্ব প্রস্তুতি ইত্যাদি না নেওয়ার জন্য। অথচ তাঁর বইতেই তিনি লিখেছেন আতাউল গণি ওসমানিকে ১০ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন।’ যুদ্ধের কোনো প্রস্তুতি যদি বঙ্গবন্ধু নাই বা নিতেন তাহলে সেখানে ওসমানিকে সামরিক উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন কেন? কেন বঙ্গবন্ধু ফেব্রুয়ারি মাসে ড. কামাল হোসেনকে স্বাধীনতার ঘোষণার খসড়া প্রণয়নের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তৎকালীন পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর একজন উচ্চ কর্মকর্তা যাঁর চাকরির অধিকাংশ সময় পশ্চিম পাকিস্তানে কাটিয়েছেন তিনি কীভাবে জানবেন যে, ১৯৬২ সাল থেকেই ছাত্রলীগের একটি অংশ নিয়ে স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি ‘নিউক্লিয়ার্স’ গঠন করা হয়েছিল। তিনি কীভাবে জানবেন ১৯৬৯ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত স্মরণ সভায় বঙ্গবন্ধু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ করেছিলেন এবং ভারতের সাথে যোগাযোগের জন্য তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য চিত্তরঞ্জন সুভারকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন। খন্দকার সাহেব কী করে ভাবলেন যে পূর্ব কোনো যোগাযোগ বা আলোচনা ছাড়াই পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাকে ভারত সরকার যাচাই-বাছাই না করেই আশ্রয় দেবেন। তিনি বারবার বলতে চেয়েছেন সশস্ত্র বাহিনীর অনেক বাঙালি অফিসার বিদ্রোহ করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল শুধু রাজনৈতিক নির্দেশনার অভাবে তা সম্ভব হয়নি? প্রশ্ন ওঠে তাঁর বেলায় কী ঘটেছিল? তিনিও কি বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুত ছিলেন, না কি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের প্রতি অনুগত থাকার? তার বক্তব্য পাঠকরা অনুমান করুন, ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান রেডিও ও টেলিভিশনে এক ভাষণে এই জঘন্য অপরাধের দায়ভার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর চাপিয়ে দেন। তিনি এই ভাষণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রশংসা ও শেখ মুজিবকে দেশদ্রোহী বলে ঘোষণা করেন।’ তিনি তাই বইতে সেখানে স্বাধীনতার প্রশ্নে দোদুল্যমান বলে বঙ্গবন্ধুকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন সেখানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের ভাষায় বঙ্গবন্ধু ‘দেশদ্রোহী’। যেখানে পাকিস্তানিরা ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চলাইটে প্রথমে পিলখানা, রাজারবাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ করে; সেখানে কয়েকদিন আগে থেকেই সেনাবাহিনীর সকল বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের নিয়ন্ত্রণ করে ফেলা হয়েছিল এবং সে রাতেই অধিকাংশ বাঙালি অফিসার বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল তখনও তিনি পাকিস্তানি সরকারের অনুগত হয়ে চাকরি করে যাচ্ছিলেন। যেখানে বাঙালি ইপিআর, পুলিশ ও সামরিক ব্যক্তিদের পেলেই হত্যা কিংবা গ্রেপ্তার করা হচ্ছিল সেখানে তিনি দিবিব রয়ে গেলেন কীভাবে একজন শীর্ষ বাঙালি অফিসার হওয়া সত্ত্বেও? তাঁর ভাষায়, ২৬ মার্চ সারাদিন কারফিউ ছিল। ২৭ মার্চ সকালে অল্পক্ষণের জন্য কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়। ২৫ মার্চ সন্ধ্যার পর থেকে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। তাই ২৭ মার্চ সকালে তাদের নিয়ে আসার জন্য নিজেই জিপ চালিয়ে আজিমপুরে যাই। পথে রাস্তার দু’পাশে ভয়ংকর ও বীভৎস দৃশ্য দেখি। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। কালো পিচের রাস্তা রক্তে লাল হয়ে গেছে। ভাবলাম এর পরতো এই হত্যাকারীদের সঙ্গে যাবার প্রশ্নই উঠে না। কয়েকদিনের মধ্যেই সরকারি কোয়ার্টার ছেড়ে আমরা পুনরায় আজিমপুরে স্ত্রীর বোনের বাসায় উঠার সিদ্ধান্ত নিলাম।’ এরপরে তিনি লিখেছেন, ‘২৭ মার্চ সন্ধ্যায় ভাবলাম এয়ারফোর্স অফিসার মেসে গিয়ে দেখি মেসের কী অবস্থা। মেসে গিয়ে দেখলাম, কয়েকজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন, লক্ষ্য করলাম একটি সেনা ভর্তি ট্রাক অফিসার মেসে প্রবেশ করল। সৈনিকদের অনেকের হাতে অগ্নিবর্ষক অস্ত্র দেখলাম। সৈনিকেরা গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। অফিসার মেসের একটু পেছনেই ছিল নাখালপাড়া গ্রাম। নাখালপাড়া গ্রামটি ছিল গরিব। রিক্সাওয়ালা ও খেটে খাওয়া মানুষের বাসস্থান। পাকিস্তানিদের ধারণা ছিল এই গরিব মানুষগুলো আসল শত্রু, কারণ এরাই সব আন্দোলনের পুরোভাগে থাকে। অগ্নিবর্ষক অস্ত্রগুলো দিয়ে এদের বাড়ি ঘরে আগুন লাগিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের শিখায় পুরো এলাকা লাল হয়ে গেল। ঢাকায় কারফিউ থাকার কারণে নাখালপাড়ার বাসিন্দারা বাসায় আবদ্ধ ছিল। সব ঘর বাড়িতে দারুণভাবে আগুন জ্বলে উঠল। তাদের তখন ঘর থেকে বের হওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। যখন তারা ঘর থেকে দৌঁড়ে বের হওয়া শুরু করে তখন এই অসহায় মানুষগুলোর ওপর পাকিস্তানি সৈন্যরা নির্মমভাবে গুলিবর্ষণ করা শুরু করল। আমার পাশে পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর কয়েকজন অফিসার দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদেরই একজন আমার সামনেই বলে উঠলেন, ‘দিস ইজ দ্য ওয়ে টু ডিল উইথ দ্য বাস্টার্ডস।’ এই কথাটা আমি জীবনে ভুলব না। নিজ চোখের সামনে এই ঘটনা দেখে আমি স্থির করলাম, এদের সঙ্গে আমি আর এক মুহূর্তও থাকব না।’ এতক্ষণে অরিন্দম! যিনি পুরো মার্চ মাস জুড়ে উথালপাতাল করেছেন পাক আর্মিদের দৌঁড়ের ওপর রাখতে তিনি ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ দেখে সিদ্ধান্ত নিলেন তাদের সঙ্গে আর না। প্রশ্ন উঠে যে পাকিস্তানিদের কাছে ওই গরিব বস্তিবাসী বাস্টার্ড এবং মৃত্যুই তাদের প্রাপ্য, এমন খুনীদের কাছে বিমান বাহিনীর শীর্ষ বাঙালি অফিসার হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত হলেন না কেন? তিনি লিখেছেন, ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে রূপ নেয়। এখান থেকে প্রথমে স্থানীয় নেতারা ও পরে মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। আমি মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা পুলিশ এবং চট্টগ্রামের সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার কথা জানতে পারি। এখানেও তথ্যগত ভুল করেছেন তিনি। কার্যত চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হয়নি। তার কিছু যন্ত্রাংশ সরিয়ে নিয়ে কালুরঘাটে অবস্থিত আরেকটি ট্রান্সমিশন কেন্দ্র থেকে ঘোষণা পাঠ ও প্রদান করা হয়েছিল। সে কেন্দ্রের ফ্রিকোয়েন্সি বেশি ছিল না বলে তার কোনো ঘোষণা ঢাকায় বসে শোনা সম্ভব নয়। যাক তারপরে তিনি লিখেছেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনী স্থলপথে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আক্রমণ করতে না পেরে ২৯/৩০ মার্চ বিমানের সাহায্যে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে বোমা বর্ষণ করে। ২৮ বা ২৯ মার্চের পর থেকে বিমান বাহিনীর যুদ্ধ জাহাজগুলো বাঙালিদের পরিবর্তে শুধু পশ্চিম পাকিস্তানি বৈমানিকদের দ্বারা উড্ডয়ন করা হতো। আমিসহ সব বাঙালি কর্মকর্তা তখন পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে ছিলাম নামে মাত্র। আমাদের কোনো দায়িত্ব-কর্তব্যে নিযুক্ত করা হতো না। পাকিস্তান বিমান বাহিনী কোথাও আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিলে আমরা ধারণা করতে পারতাম কিন্তু কবে, কখন কোথায় তা কার্যকর হবে তা নির্দিষ্টভাবে জানতে পারতাম না।’ প্রশ্ন উঠতে পারে যিনি ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় পাক সেনাদের নির্মমতা দেখে তাদের সঙ্গ ত্যাগ করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি ২৯ তারিখ পর্যন্ত তাঁর ভাষায় বিমান বাহিনীতে চাকরি করলেন কী করে? আর তাঁর কথায় মনে হলো তাঁকে বা তাঁদের বসিয়ে না রেখে দায়িত্ব বা কর্তব্য অর্পণ করলে তিনি খুশি হতেন। (পরবর্তী সপ্তাহে) Email - [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ