ষোড়শ সংশোধনী বনাম বর্তমান আইন সভা-কামরুল হাসান বাদল কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 05/09/2014-08:59am:   
(গত সপ্তাহের পর)
গত সপ্তাহে বলার চেষ্টা করেছিলাম যে, বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের ওপর ন্যস্ত করার লক্ষ্যে সংবিধানে যে সংশোধনী অর্থাৎ ষোড়শ সংশোধনী পাশ হতে যাচ্ছে তা কোনোভাবেই সংসদীয় গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। বরং তা না থাকাটাই সাংঘর্ষিক ও বিপরীত। তবে প্রশ্ন তুলেছিলাম এ ক্ষমতা যে সংসদ বা যে ধরনের সংসদ সদস্যদের হাতে তুলে দিতে যাচ্ছি সে সংসদ বা তার সদস্যগণ তার জন্যে কতটা উপযুক্ত। পূর্বেই উল্লেখ করেছিলাম বিগত কয়েকটি সংসদের তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে দেখতে পাই তাতে প্রতিনিধিত্বকারীর মধ্যে প্রকৃত রাজনীতিকের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে। সৎ, দেশপ্রেমিক ও নিবেদিত রাজনীতিকের সংখ্যাতো আশঙ্কাজনকভাবে কম। বলা যায় বিরলপ্রজ হয়ে উঠছেন তারা এবং সে সাথে এ-ও উল্লেখ করেছিলাম যে, রাজনীতিকে কলুষিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল বেশ আগে। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার পরে যে শক্তিটি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল তারাই মূলত তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে রাজনীতিকদের কেনাবেচা ও দলছুট করার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। বাস্তবেই রাজনীতিকদের জন্যে রাজনীতি কঠিন করে ফেলা হয়েছিল।
একজন জাতীয় সংসদ সদস্য পক্ষান্তরে যিনি একজন আইনসভার সভ্য তাঁর কাঁধে এত বেশি কাজ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তার পদটিকে এত বেশি লাভজনক ও লোভনীয় করা হয়েছে যে, তা আয়ত্ত করতে, দখল করতে সুবিধাবাদীরা উন্মুখ হয়ে থাকে। একজন সংসদ সদস্যের হাত দিয়েই তার এলাকায় শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের টাকা খরচ হয়। বদলি, নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে কোনো কাজ একজন সংসদ সদস্যের অনুমোদন ছাড়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। কাজেই একজন মানুষ না চাইলেও দেশের বিদ্যমান ‘সিস্টেম’ তাকে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করে রেখেছে। ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়ে উঠলে তার অপব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
এরশাদ আমলে প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীয়করণ করতে গিয়ে উপজেলা পদ্ধতির প্রবর্তন করা হয়েছিল। সরকারের উন্নয়ন কাজ স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে করার লক্ষ্য(!) নিয়ে তা করা হলেও মূলত কখনও তা সঠিক ও সফলভাবে প্রয়োগ করা যায়নি। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে উপজেলা প্রশাসনকে অকার্যকর করে রাখে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও উপজেলা প্রশাসন পুরোপুরি সক্রিয় হতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বাধা হিসেবে কাজ করেছে সংসদ সদস্যরাই। তাদের এলাকায় নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাব খর্ব হতে পারে মনে করে সংসদ সদস্যরা উপজেলা বা স্থানীয় সরকারকে কার্যকর ভূমিকা পালনে বাধা প্রয়োগ করেছে। সংসদ সদস্যরাই যেহেতু আইন প্রণয়ন করে থাকেন সেহেতু তাঁদের ক্ষমতা খর্ব করার মতো কোনো আইন প্রণয়নে তারা সম্মত হননি। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধী দলের ভূমিকা ছিল এক ও অভিন্ন। যে কারণে উপজেলা নির্বাচন সম্পন্ন হলেও সরকারের পক্ষ থেকে জেলা পরিষদ নির্বাচনে আর আগ্রহ দেখা যায়নি। এক সময়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানগণ সরকার কর্তৃক মনোনীত হয়ে উপমন্ত্রীর মর্যাদা ভোগ করতেন। বর্তমান সরকারের আমলে সে মর্যাদাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
এখন একটি প্রশ্ন আসতে পারে উন্নয়ন কাজে সরকার সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ত করবেন না কি স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি উপজেলা চেয়ারম্যানদের ব্যবহার করবেন। দেশের সুশীল শ্রেণির একটি অংশ উন্নয়ন কাজে স্থানীয় সরকারকে ব্যবহার করা এবং সে সাথে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর মত ব্যক্ত করে থাকেন। এখন আমরা দেখতে চাই সে ক্ষেত্রে আমাদের কী কী অসুবিধাগুলোর সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
১৯৪৭ সালে একই সাথে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হলেও ভারতে গণতন্ত্র বিকাশের সাথে সাথে একই সমান্তরালে শক্তিশালী হয়েছে সংসদীয় গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। যে কারণে সেখানে কার্যকর সংসদের পাশাপাশি কার্যকর তাদের স্থানীয় সরকারের তৃণমূল সংগঠন গ্রাম পঞ্চায়েত। কিন্তু পাশাপাশি অপর রাষ্ট্র পাকিস্তানে না হয়েছে গণতন্ত্রের বিকাশ, না হয়েছে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিকাশ। পাকিস্তানে গণতন্ত্র বিকাশই লাভ করতে পারেনি। মুখ থুবড়ে পড়েছে বারবার। তেমনি করে স্থানীয় সরকারের তৃণমূল সংগঠন ইউনিয়ন পরিষদ সমূহেও হয়নি এবং সেখানেও প্রতিনিধিত্ব করেছে কিছু ব্যক্তি যারা পক্ষান্তরে পাকিস্তানের অগণতান্ত্রিক শক্তিকে ক্ষমতায় থাকার সিঁড়ি হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৯ সানে পাকিস্তানে জেনারেল ইসকান্দর মীর্জার নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। এরপর জেনারেল ইসকান্দর মির্জাকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসেন সেনা প্রধান জেনারেল আইউব খান। তিনি ক্ষমতায় এসে তা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে পাকিস্তানে প্রবর্তন করেন তাঁর রাজনৈতিক দর্শন প্রসূত বেসিক ডেমোক্রেসি বা বিডি।
আইউব খানের প্রবর্তিত বেসিক ডেকোক্রেসিতে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হতেন ইউনিয়ন বোর্ডের (বর্তমান পরিষদ) চেয়ারম্যানগণ। এটি ছিল আইউব খানের নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র। যেখানে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার ছিল না। সে ব্যবস্থায় বিত্তবান, প্রভাবশালী ও সরকারের তোষামোদকারীরা টাকা, ক্ষমতা উপঢোকন কখনওবা ভয় দেখিয়ে চেযারম্যানদের ভোট আদায় করে প্রাদেশিক ও গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হতেন। আমরা একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখতে পাব আইউব খান তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে যেভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছিলেন পরবর্তীতে প্রতিটি সামরিক শাসক সে ধারা বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন, অর্থাৎ তারাও তাঁদের অবৈধ ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার খাতিরে প্রথমেই ব্যবহার করেছেন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও তার প্রতিনিধিদের। জনগণ ও তার প্রতিনিধিদের ভয় পায় বলে প্রায় প্রতিটি স্বৈরশাসক প্রথমে বেছে নিয়েছে স্থানীয় সরকারকে। সংসদকে পাশ কাটিয়ে কিংবা সংসদ ভেঙে দিয়ে এসব স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সাহায্যে দেশ পরিচালনার চেষ্টা করেছে। জেনারেল জিয়া, এরশাদ (তারা উপজেলা পদ্ধতির মাধ্যমে) এবং সর্বশেষ- ১/১১ সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দেশ পরিচালনার ইতিহাস দেখলে তার সত্যতা পাওয়া যাবে। কাজেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও তার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি গণতন্ত্রমনস্ক জনগোষ্ঠীর আস্থা ও সমর্থন খুব বেশি বলে আমার মনে হয় না। ইউনিয়ন পরিষদের সামান্য মেম্বার থেকে চেয়ারম্যান এবং অধুনা উপজেলা চেয়ারম্যানদের দুর্নীতির খতিয়ান সংসদ সদস্যদের চেয়ে কম দীর্ঘ নয়।
এ ছাড়া আরও একটি আশঙ্কার কারণ আছে। একজন সংসদ সদস্য তার ভালো-মন্দ-কাজের জন্যে তার দল ও সংসদের কাছে দায়ী থাকেন। খুব বেশি নয়, ১০ থেকে ২০ জন সংসদ সদস্যের দুর্নীতি ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে একটি সরকারের ভিতও নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের জবাবদিহি থাকে সংসদে। আর সেখানে শাস্তি না হলেও পরবর্তী নির্বাচনে জনগণই তাকেসহ তার দলকে উপযুক্ত জবাবটুকু প্রদান করতে পারে। কাজেই একজন সদস্য সব কিছুর উর্ধ্বে থাকতে পারেন না। কম বেশি অন্য সদস্যদের কাছে হলেও তাকে ভর্ৎসনা শুনতে হয়। অন্যদিকে আগেই বলেছি স্থানীয় সরকার বা উপজেলা চেয়ারম্যান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানগণ নির্বাচিত হন নির্দলীয়ভাবে। তার কর্মকাণ্ডের জন্যে কোনো দলের কাছে তাঁকে জবাবদিহি করতে হয় না। দুর্নীতিতেও তারা সংসদ সদস্যদের চেয়ে কম অগ্রসর নন। কয়েকজন সংসদ সদস্যের কৃতকর্মের কারণে পার্টি ক্ষমতা হারাতে পারে কিন্তু উপজেলা চেয়ারম্যানরা এক একজন স্বতন্ত্র। কাজেই তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো দলীয় শৃঙ্খলাও কার্যকর নয়। আরেকটু খুলে যদি বলতে হয় তাহলে বলি এ ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরাই বেশি দুর্নীতির সাথে যুক্ত অতীতের অভিজ্ঞতা তা-ই বলে।
এখন জিজ্ঞাসা তাহলে বাকি থাকল কে? সংসদ সদস্য থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান দুপক্ষ নিয়েই আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। তাহলে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করবে কে?
এ সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো- ব্যক্তিকে সৎ হওয়া। একজন সৎ মানুষের হাতে যে দায়িত্বই অর্পণ করুন না কেন, তা সঠিকভাবে পরিচালিত হতে বাধ্য। আর সৎ না হলে সে দায়িত্ব একজন সংসদ সদস্যকে দেওয়া হোক বা উপজেলা চেয়ারম্যানকে দেওয়া হোক ফল হবে অভিন্ন। দায়িত্ব নিতে হবে জনগণকে। জনগণ যদি যে কোনো মূল্যে দুর্নীতিবাজ নেতাকে প্রত্যাখ্যান করে পরিস্থিতি পাল্টাতে বাধ্য। কারণ ব্যক্তি সৎ না হলে সমাজ সৎ হবে না। সমাজ সৎ না হলে রাষ্ট্রও সৎ হবে না। কাজেই আগে ব্যক্তিকে সৎ হতে হবে। তাতে যে প্রক্রিয়া বা যে পদ্ধতিই বহাল থাকুক না কেন তাতে সুফল পাওয়া যাবে।
জনগণ যদি চায় তার প্রতিনিধি হোক একজন ভালো মানুষ, সৎ মানুষ তবে তা-না হয়ে উপায় কী। প্রশ্ন হলো জনগণ কি তা চায়। না কি পুরনো সে কথাটিই পুনরায় স্মরণ করব যে, ডাকাতের সর্দার হয় ডাকাত, আউলিয়ার সর্দার হবে আউলিয়া।
জনগণ সৎ হলে তার প্রতিনিধিরা সৎ হবে না কেন?

সর্বশেষ সংবাদ