সারা শহর কসাইখানা! কামরুল হাসান বাদল কবিও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 21/08/2014-02:15pm:   
কৃষি প্রধান বাংলাদেশে এক সময়ে অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র ছিল হাট বা বাজার। শিল্প স্থাপনের আগে কৃষি ও কৃষিপণ্যই ছিল বেচা-কেনা বা অর্থ প্রবাহের প্রধান মাধ্যম। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে সে টাকায় অন্য পণ্য ক্রয় করতো মানুষ। কয়েকটি গ্রাম মিলে একটি বাজার আর সে বাজারে সপ্তাহে এক কখনও দুদিন ছিল হাটবার। হাটবারেই সপ্তাহের অন্যান্য দিনের কেনাবেচা হতো। এই ব্যবস্থার বড় আয়তন ছিল গঞ্জ বা জেলা-মহকুমা শহরের পাইকারি বাজার, যেখান থেকে গ্রামের হাটবাজারের জন্যে পণ্য কিনে নিয়ে যেত খুচরা বিক্রেতারা। এখনও গ্রাম বাংলার অর্থনীতির প্রধান প্রাণকেন্দ্র এই হাট বা বাজার। এই বাজার বা হাট শহরেও ছিল। শহরেও এক সময় হাটবার প্রচলিত ছিল যেদিন বাজারটি সাধারণ দিনের চেয়ে বড় আকারে বসতো। চট্টগ্রামে বাজারগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হাট বলেই পরিচিত। বাজার নামটি ব্যবহৃত হচ্ছে গত শতকের প্রায় মাঝামাঝি থেকে, কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া। চট্টগ্রাম শহরের বাজারগুলোও হাট দিয়ে নামকরণ করা। যেমন-বক্সিরহাট, বহদ্দারহাট, বিবিরহাট, ইশাইন্যার হাট। এছাড়া গ্রামাঞ্চলের বাজারগুলোর অধিকাংশের নাম হাট দিয়ে।
গ্রামে-গঞ্জে এই হাটের ওপর নির্ভরশীল ছিল মানুষ। নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য কেনা থেকে শুরু করে উৎসব আনন্দে কাপড় চোপড়, জুতা সেন্ডেল ইত্যাদি কেনা হতো হাট থেকে। এত ঝলমলে বিপণিকেন্দ্র বা বড় বড় মার্কেট, সুপার সেন্টারতো তখন ছিল না। এ ধরনের হাটে মাছ-মাংস থেকে শুরু করে কোরবানির গরু-ছাগলও বিক্রি হতো। বড় বড় হাটগুলোতে কিংবা অবস্থাপন্ন গ্রামগুলোর হাটে তখন গরু জবাই হতো শুধু হাটবারেই। ছোট হাট বা ক্রয় ক্ষমতা কম এমন এলাকায় হাট বারেও গরু জবাই হতো না ক্রেতার অভাবে। বাড়ির অতিথি বা কোনো ছোটখাটো অনুষ্ঠানে গরুর মাংসের প্রয়োজন পড়লে থানা, মহকুমা বা জেলা সদরের বাজারে যেতে হতো। এখন অবশ্য সময় পাল্টেছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। শহরের অবস্থা বাদই দিলাম গ্রামেও এখন অনেক স্থানে সকালেই কয়েকটি গরু জবাই হয়। সন্ধ্যার আগে আগে তা বিক্রিও হয়ে যায়। গ্রামেও এখন শুধু সপ্তাহের দুদিন হাটের জন্যে অপেক্ষা করতে হয় না। অধিকাংশ বাজারে এখন প্রতিদিনই হাট। হাট বা বাজার ছাড়াও এখন গ্রাম শহরের রাস্তার পাশেই গড়ে উঠেছে ছোট ছোট বাজার যেখানে সকাল থেকে রাত অবধি প্রায় সকল পণ্যই বেচাকেনা হয়। যে কারণে গ্রামাঞ্চলের অনেক পুরনো হাট এখন বিলীনের পথে। সে সব হাটে এখন আগের সে জৌলুস নেই। এর অবশ্য আরেকটি কারণও আছে আগে বাজার বা হাট গড়ে উঠতো কোনো না কোনো নদী বা খালকে কেন্দ্র করে। আগে যেহেতু নদী পথেই পণ্য পরিবহন হতো বেশি সে কারণে গড়ে উঠেছিল এই ব্যবস্থা। এখন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটায় অধিকাংশ পণ্য পরিবহন করা হয় সড়কপথে আর অন্যদিকে নদী ও খালগুলো ভরাট ও শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে নৌকা চলাচলে ব্যাঘাত ঘটায় নদীপাড়ের বাজারগুলো এখন মৃতপ্রায়। তার বদলে সড়কের আশেপাশেই গড়ে উঠেছে নতুন নতুন হাটবাজার। শহরের চিত্রও পাল্টেছে। প্রাচীন ও এক সময়ের নামকরা বাজারগুলোর জৌলুস এখন ম্রিয়মান। এখন শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঠেলাগাড়িতে সবজি থেকে শুরু করে মুরগি শুটকি ইত্যাদি বিক্রি হয়। আর সন্ধ্যার পরে পরে শহরের অনেক স্থানে ফুটপাত জুড়ে বসে মাছের বাজার। মানুষ এখন সকালে উঠেই বাজারে দৌড়ায় না। বরং অফিস বা নানান কাজ সেরে সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার সময় এসব দোকান বা ফুটপাত থেকে সওদা করে নেয়। নগরে লোকসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্টে যাচ্ছে হাটবাজারের চিত্রও। পুরনো হাট ভেঙে এখন শহরের অধিকাংশ সড়ক ও ফুটপাতগুলো বাজারে পরিণত হয়েছে। (অবশ্য এর বাইরে পরিকল্পিত ও অভিজাত পরিবর্তনও আছে যেমন সুপার স্টোরগুলো। যেখানে পরিবারের সব পণ্য অর্থাৎ সুচ থেকে পারফিউম সবজি থেকে মাছ মাংস সব পণ্য পাওয়া যায়) এখন ফুটপাতে বসছে বাজার যেখানে শুধু শাক-সব্জি নয় রীতিমত মাছের বিশাল বাজার বসে সেখানে। এছাড়া এখন বিভিন্ন পাড়া বা মহল্লায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে গরুর মাংসের দোকান। বাজার বা হাটের বাইরে এসব দোকান মূলত অননুমোদিত। এসব দোকান ছাড়াও বিভিন্ন উৎসব-পরবে পাড়ায় পাড়ায় স্থানীয় লোকদের উদ্যোগে গরু জবাই হয়। যা ভাগ বা ভাগা করে বিক্রি করা হয়ে থাকে। পাড়ার লোকেরাই এসব মাংস কিনে নেয়। শবে বরাত, শবে কদর, মহররম ঈদ ইত্যাদি উপলক্ষে পাড়ায় পাড়ায় এখন অনেক পশু জবাই হয়ে থাকে। আমি যে এলাকায় থাকি সে পাড়াতেই গত রমজানেই প্রায় ৬/৭টি গরু জবাই করা হয়েছে। অনেক সময় পাড়ার মানুষের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখতে বা চক্ষুলজ্জায়ও অনেকে এসব মাংস কিনে থাকেন। তবে এভাবে পশু জবাই ও তার মাংস বিক্রি কতটা আইনসিদ্ধ তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
নগরীতে যে কোনো পশু জবাই করার জন্য সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত ও প্রতিষ্ঠিত নির্দিষ্ট কসাইখানা আছে। নিয়ম হলো এখানে পশু জবাই করার আগে তা সিটি কর্পোরেশন নিযুক্ত পশু চিকিৎসক পরীক্ষা করবেন। যে পশুর মাংস মানবদেহের জন্যে ক্ষতিকর নয় শুধুমাত্র সে সব পশু জবাই করে মাংস বিক্রি করার অনুমতি প্রদান করে থাকেন। নির্দিষ্ট চিকিৎসকের সিল ছাড়া এই মাংস মূলত বিক্রির জন্য অনুমোদিত নয়। যদিও অভিযোগ আছে সিটি কর্পোরেশনের এসব কসাইখানায় চিকিৎসকরা নিয়মিতভাবে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন না। কসাই বা কসাইখানার কর্মচারীরাই মাংসের গায়ে সিল মেরে দেন।
এখন প্রশ্ন হলো এভাবে পরীক্ষাবিহীন পশুর মাংস জনস্বাস্থ্যের জন্যে কতটা নিরাপদ। কসাইখানায়তো পরীক্ষা হচ্ছে না কে সাথে যারা শহরজুড়ে যেভাবে স্থানীয় মাংসের দোকান গড়ে উঠেছে সেখানেও পশু জবাইয়ের আগে কে করছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা। অসুস্থ পশুর মাংস জনস্বাস্থ্যের জন্যে হুমকি স্বরূপ। এ ছাড়া পশুকে দ্রুত মোটা করার জন্যে এমন কিছু ওষুধ খাওয়ান হয় যা পরবর্তীতে মানুষের দেহেও নানা রকম মারাত্মক রোগের জন্ম দিচ্ছে। উন্নত বিশ্বের কোথাও এভাবে প্রকাশ্যে ও পরীক্ষাবিহীন পশু জবাই ও তার মাংস বিক্রি করা আইনসিদ্ধ নয়। এশিয়া ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ছাড়া প্রকাশ্যে পশু জবাই নিষিদ্ধ। কিন্তু আমাদের দেশে এ কাজটি করা হয় অত্যন্ত অমানবিক ও অনেকটা আদিমভাবে। কোরবান ঈদে বিভিন্ন ওরশ, মেজবান ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের জন্যে বসতি সড়ক ও অন্যান্য স্থানে প্রকাশ্যে জবাই করা হয় পশু। ব্যাপারটি দৃষ্টিকটুতো বটেই সাথে সাথে প্রচণ্ড অমানবিকও বটে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশেও কোরবানির পশু এভাবে প্রকাশ্যে জবাই করা যায় না। পশ্চিমা বিশ্বেতো নয়-ই। ওসব দেশে নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া অন্য কোথাও পশু জবাই নিষিদ্ধ। শুধু তাই নয় যে কোনো খাদ্য দ্রব্য বিক্রির আগে তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদন করিয়ে নিতে হয়। একটি সভ্য ও আধুনিক সমাজে প্রকাশ্যে পশু জবাই শোভনীয়ও নয়।
সামনে পবিত্র কোরবানের ঈদ। এই ঈদে লাখ লাখ পশু জবাই হবে আমাদের দেশে এবং তা সবই প্রকাশ্যে জনপদ ও লোকালয়ে। যা খোদ সৌদী আরবেও সম্ভব নয়। ওখানেও লাখ লাখ হাজি কোরবান করেন তবে তা নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ও তাদের নিয়ন্ত্রণেই। কাজেই বাংলাদেশেও প্রকাশ্যে পশু জবাই করার ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করা উচিত। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া পশু জবাই, যত্রতত্র পশু জবাই ও মাংস বিক্রি বন্ধ করা উচিত।
বেশি জনসংখ্যার দেশ বলে অনেক সময় অনেক কিছু হয় নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায়। সামনে কোরবান ঈদে যেখানে লাখ লাখ পশু জবাই হবে সেখানে হয়ত সব পশু পরীক্ষা, নিরীক্ষা করাও নির্দিষ্ট স্থানে জবাই করা সম্ভব হবে না। তবে জনগণ যদি স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে ওঠে, তারা যদি নাগরিক হিসেবে সভ্য হয়ে ওঠে আমার ধারণা এ ব্যবস্থাও তারা নিজেরাই করে নিতে পারবেন নিজেদের উদ্যোগে এবং তা করতে হবে নিজ নিজের পরিবার ও স্বজনদের স্বাস্থ্য রক্ষার খাতিরেই।
সারা শহরকে কসাইখানা না বানিয়ে বাজার ব্যবস্থাপনায় এখন শৃঙ্খলা আনয়ন জরুরি।
Email : [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক