আজ জাতীয় শোক দিবস / কামরুল হাসান বাদল কবিওসাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 15/08/2014-11:51am:   
আমরা তখন রুটিন মাফিক ট্রিগার টিপলাম/তোমার বক্ষ বিদীর্ণ করে হাজার পাখির ঝাঁক
পাখা মেলে উড়ে গেল বেহেশতের দিকে/তারপর ডেড স্টপ।
তোমার নিষ্প্রাণ দেহখানি সিঁড়ি দিয়ে গড়াতে গড়াতে গড়তে/আমাদের পায়ের তলায় এসে হুমড়ি খেয়ে থামলো
কিন্তু তোমার রক্তস্রোত থামলো না। সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে/বারান্দার মেঝে গড়িয়ে সেই রক্ত, সেই লাল টকটকে রক্ত
বাংলার দুর্বা ছোঁয়ার আগেই আমাদের কর্নেল/সৈন্যদের ফিরে যাবার বাঁশি বাজালেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেষরাতে সভ্যতার ইতিহাসে বর্বরতম হত্যাকাণ্ডের চিত্রটি কবি নির্মলেন্দু গুণ তার কবিতায় এভাবে এঁকেছেন। যদিও সে রাতের হত্যাকাণ্ডের বর্বরতার সঠিক চিত্রটি আমরা কখনই পাব না। পাব না কারণ তা বিবৃত করার মতো কাউকে বাঁচতে দেওয়া হয়নি। এমনকি শিশু রাসেলকেও। বস্তুত সে রাতের নির্মমতা ও শোককে প্রকাশ করার সঠিক শব্দ, বাক্য কিংবা উপস্থাপন শৈলীও আমাদের জানা নেই। তারপরেও প্রতিবছর এইদিনটি আসে। গ্লানি, অপমান, বেদনা ও জাতির জনকের মৃত্যুর অপার শোক নিয়ে আসে।
আজ ১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবস। রাজনীতির কবি, ইতিহাসের রাখাল রাজা, বাঙালি জাতির জনক, এই রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ৪০তম মৃত্যুদিবস। তাঁর জন্ম গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বিখ্যাত শেখ পরিবারে। তাঁর পিতার নাম শেখ লুৎফর রহমান, মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল তাঁর ছোট দাদা শেখ আবদুর রশিদ প্রতিষ্ঠিত ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এমই স্কুলে। সেখানে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর তিনি তাঁর পিতার কর্মস্থল গোপালগঞ্জে চলে যান। ভর্তি হন গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে। তাঁর পিতা ছিলেন আদালতের সেরেস্তাদার। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন চঞ্চল প্রকৃতির।
খেলাধুলা, গান বাজনা ভীষণ পছন্দ করতেন। তবে ছোটবেলাতেই বেরিবেরি রোগ ও চোখে গ্লুকোমা হওয়ায় তাঁর পড়াশোনার বিরতি ঘটে। ছাত্র থাকাকালীন তাঁর ভেতরে নেতৃত্বসুলভ আচরণ গড়ে ওঠে। ১৯৩৮ সালে, শেরেবাংলা এ কে ফজুলল হক তখন প্রধানমন্ত্রী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী।
তাঁরা দুজন গোপালগঞ্জে এলেন। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলার ভার পড়ল তাঁর ওপর। সে অনুষ্ঠান শেষে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে পরিচয় আলাপের সুযোগ হয় তাঁর এই পরিচয়ই পরবর্তীতে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি যখন কলকাতায় বেকার হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করছিলেন তখন তাদের ঘনিষ্ঠতা আরও বৃদ্ধি পায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের আগে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিরসনে ও দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
দেশবিভাগের পরে ১৯৪৯ সালে ঐতিহাসিক কারণে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের সময়ে তিনি কারাগারে থেকেও আন্দোলনে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করলে তিনি সে মন্ত্রিসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে বঙ্গবন্ধু ‘পূর্ব বাংলা’র পরিবর্তে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামকরণের বিরোধিতা করে একটি ভাষণ প্রদান করেন। ১৯৫৬ সালে ৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে খসড়া শাসনতন্ত্রে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান। ১৯৫৭ সালের ৩০ মে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা সামরিক শাসন জারি করলে তিনি ১১ অক্টোবর গ্রেফতার হন। এরপর থেকে তিনি কখনও জেলে কখনও মুক্তভাবে আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে জাতিকে স্বাধীনতার পথে নিয়ে যেতে থাকেন।
১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল আওয়ামী লীগ পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করলে ৭ মার্চ তৎকালীন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিনি এক ভাষণ প্রদান করেন যা বিশ্ব ইতিহাসে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ভাষণের মধ্যে অন্যতম। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানিরা ঘুমন্ত বাঙালি জাতির ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এর কিছুক্ষণ পরে পাকিস্তানি জান্তা তাঁকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে আটক করে রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের ৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ কার্যত তাঁর নামেই পরিচালিত হয়। ত্রিশ লাখ শহীদ আর প্রায় ৩ লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে বিজয় অর্জিত হলে পাকিস্তান তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। তিনি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে এসে শাসনভার গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কিছু বিশ্বাসঘাতকের গুলিতে সপরিবারে প্রাণ হারান একটি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা জনক ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
একটি সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়েও নিজ নেতৃত্বগুণ, মেধা ও পরিশ্রমে একটি জাতির জনকে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। তিনি এমন একটি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন যা পূর্বে কখনও ছিল না। অর্থাৎ বাঙালিরা হাজার বছরের ইতিহাসে কখনও স্বাধীন ও স্বশাসিত ছিল না। তাঁদের কোনো রাষ্ট্র ছিল না। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশই প্রথম বাঙালি জাতির স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। ইতিহাসের এমন মহানায়ককে হত্যা করা হয়েছিল অত্যন্ত নির্দয় ও নিষ্ঠুরভাবে। বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড একটি কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। মাত্র দু দশক সময়ের মধ্যে তিনি তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় একটি জাতিকে স্বাধীনতা অর্জন করে দিয়েছিলেন। মাত্র ৫১ বছর বয়সে পরিণত হয়েছিলেন একটি জাতির জনকে। তাঁর দেশপ্রেম, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, জনগণের প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসা যুগে যুগে বিশ্ব রাজনীতিতে প্রেরণা হয়ে থাকবে, আদর্শ হয়ে থাকবে।
রাষ্ট্র পরিচালনায়ও তিনি ছিলেন অনুসরণীয়। স্বাধীনতা প্রাপ্তির মাত্র এক বছরের মধ্যে তিনি একটি সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন যা বিশ্বের একটি অন্যতম সংবিধান হিসেবে বিবেচিত। তিনি রাষ্ট্রের মূল চার স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন
গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ। দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও তিনি রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধারণ করে অসীম উদারতা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমঅধিকার ও শোষণমুক্ত একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু তার সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই প্রতিক্রিয়াশীলরা তাঁকে হত্যা করে। এখন তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল তাঁর প্রতি আমরা যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে পারি শুধু।

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক