অসমাপ্ত আত্মজীবনী বঙ্গবন্ধু / কামরুল হাসান বাদল কবিওসাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 11/08/2014-11:27pm:   
“বন্ধুবান্ধবরা বলে তোমার জীবনী লেখ”। সহকর্মীরা বলে, “রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাবলী লিখে রাখ, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে”। আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বললো, “বসেই তো আছো, লেখ তোমার
জীবনকাহিনী।” বললাম, “লিখতে যে পারি না, আর এমন কি করেছি যা লেখা যায়। আমার জীবনের ঘটনাগুলো জেনে জনসাধারণের কি কোন কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকুই বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।”….
“হঠাৎ মনে হলো লিখতে ভাল না পারলেও ঘটনা যতদূর মনে আছে লিখে রাখতে আপত্তি কি? সময় তো কিছু কাটবে। বই ও কাগজ পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে চোখ দুইটাও ব্যথা হয়ে যায়। তাই খাতাটা নিয়ে লেখা শুরু করলাম। আমার অনেক কিছুই মনে আছে। স্মরণশক্তিও কিছুটা আছে। দিন তারিখ সামান্য এদিক ওদিক হতে পারে, তবে ঘটনাগুলো ঠিক হবে বলে আশা করি। আমার স্ত্রী যার ডাক নাম রেনু আমাকে কয়েকটি খাতাও কিনে জেলগেটে জমা দিয়ে গিয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছেন। রেনু আরও একদিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।”
এ যাবতকালের সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ’ অসমাপ্ত আত্মীজীবনী’র শুরুর অংশ বিশেষ এটি। কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর চিঠিগুলো যখন ইতিহাসের অংশ হতে দেখতাম, কিংবা বিশ্বের অনেক বড় বড় রাজনৈতিক নেতার আত্মজীবনী পড়ার, দেখার অথবা শোনার সুযোগ হতো তখন আমি এক অদ্ভুত হীনম্মন্যতায় ভুগতাম। বাঙালি জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু কি কোনোদিন কিছু লিখেননি? তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনে কারো কাছে কি একটি চিঠিও লিখেননি। এমন কি তাঁর স্ত্রী বা সন্তানদের কাছেও? তিনি লিখলে কেমন লিখতেন। ১৯৭৫ এ তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তারপরে দীর্ঘকাল তাঁর বিরুদ্ধবাদীরা তাঁকে নিয়ে এতসব অপপ্রচার, নিন্দা আর কুৎসা রটিয়েছিল যে, তা একটি সময় প্রায় সত্যে পরিণত হয়ে উঠেছিল। জার্মানির হিটলারের তথ্য উপদেষ্টা গোয়েবলস বলতেন, ‘একটি মিথ্যাকে দশবার প্রচার কর এক সময় তা সত্যি বলে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাবে।’ একটি সময়ে এই দেশের অনেক রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী (!) বঙ্গবন্ধুকে অর্ধশিক্ষিত বলতেও দ্বিধা করেনি। কিন্তু পরবর্তীতে স্বাধীনতার পরপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমে দেয়া বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তাঁর ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস, দেশপ্রেম, জনগণের প্রতি ভালবাসা আর শুদ্ধ ইংরেজি উচ্চারণ শুনে আমার হীনম্মন্যতা অনেকটা কেটে গিয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম না আমার জন্যে কিংবা বাঙালি জাতির জন্য কিংবা বিশ্বের সকল ত্যাগী, সৎ ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিকদের জন্যে একটি চরম বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। আর তা হলো “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” শেখ মুজিবুর রহমান। হাতে আসা এবং পাঠের আগ পর্যন্ত। বাঙালির আরেক শ্রেষ্ঠতম সন্তান রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’।
অথচ বঙ্গবন্ধু কত সহজেই না তাঁর জীবনের কথা, দেশের কথা, মানুষ আর রাজনীতির কথা লিখলেন। বাংলাভাষার যে কোনো শক্তিমান লেখকের জন্যে তা এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। তাঁর বর্ণনা চরিত্র চিত্রন, ঘটনার সূক্ষ্ম বর্ণনা ভাষাশৈলী সব মিলিয়ে এই গ্রন্থটি একদিকে ইতিহাসের আকর হওয়া সত্ত্বেও উপন্যাসের মতো গতিশীল ও সুখপাঠ্য। সততা হচ্ছে একজন লেখকের প্রধান শক্তি। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু কেমন, তার কয়েকটি বর্ণনা তুলে দিচ্ছি। ‘তখন পূর্ব বাংলায় ভয়াবহ খাদ্য সংকট চলছে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী। তিনি হুকুম দিলেন কলকাতার বড় বাজার ঘেরাও করতে। সেখানে গুদামের পর গুদাম চাউলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও কাপড় গুদামজাত করে রেখেছিল মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা। শহীদ সাহেব এসব উদ্ধার করলেন বটে তবে মাড়োয়ারিরা তার বদলা নিতে কয়েক লক্ষ টাকা চাঁদা তুলে কয়েকজন এমএলএকে কিনে নেয়। এরপরে লীগ মন্ত্রিসভার পতন ঘটে প্রবর্তিত হয় গভর্নর এর শাসন। এমন পরিস্থিতির পরে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “আমি কিছু সংখ্যক ছাত্র নিয়ে সেখানে উপস্থিত ছিলাম। খবর যখন রটে গেল লীগ মন্ত্রীত্ব নাই, তখন দেখি টুপি ও পাগড়ি পরা মাড়োয়ারিরা বাজি পোড়াতে শুরু করেছে এবং হৈ চৈ করতে আরম্ভ করেছে। সহ্য করতে না পেরে, আরও অনেক কর্মী ছিল, মাড়োয়ারিদের খুব মারপিট করলাম, ওরা ভাগতে শুরু করলো।” সাধারণত আত্মজীবনীতে মানুষ নিজের দুর্বলতার কথাগুলো প্রকাশ করেন না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম তিনি অত্যন্ত সততার সাথে তাঁর জীবনের এই অংশগুলোও প্রকাশে দ্বিধা করেন নি। তাঁর পক্ষেই বলা সম্ভব। আবুল হাশিম সাহেব মিল্লাত পত্রিকার প্রেস বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সকলে বললো “তুমি বললেই আর ভয়েতে বিক্রি করবে না।” বললাম, ঠিক আছে আমি অনুরোধ করতে পারি।” এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু হাশিম সাহেবের সাথে রেগে কথা বলেছিলেন। এরপর তিনি লিখেছেন, “পরের দিন ঐ সমস্ত বন্ধুরা আবার আমার কাছে এসে বললো, “হাশিম সাহেব খানা খান না। শুধু বলেন, মুজিব আমাকে অপমান করলো।” “আমি হাশিম সাহেবের কাছে গিয়ে বললাম, আপনি মনে কিছু করবেন না। আমার এভাবে কথা বলা অন্যায় হয়েছে, আপনি যা ভাল বোঝেন তাই করুন। আমার কিছুই বলার নাই।” হাশিম সাহেব হিন্দুস্থানে থাকবেন, আমি চলে আসবো পাকিস্তান। আমার বাড়িও পাকিস্তানে। আমি যাওয়াতে তিনি খুশী হয়েছিলেন। তাঁর সাথে ভিন্নমত হতে পারি কিন্তু তাঁর কাছ থেকে যে রাজনীতির শিক্ষা পেয়েছি, সেটাতো ভোলা কষ্টকর। আমার যদি কোন ভুল হয় বা অন্যায় করে ফেলি, তা স্বীকার করতে আমার কোন দিন কষ্ট হয় নাই। ভুল হলে সংশোধন করে নেবো, ভুল তো মানুষেরই হয়ে থাকে। আমার নিজেরও একটা দোষ ছিল আমি হঠাৎ রাগ করে ফেলতাম। তবে রাগ আমার বেশি সময় থাকতো না।” “আমি চিন্তাভাবনা করে যে কাজটা করবো ঠিক করি তা করেই ফেলি। যদি ভুল হয়, সংশোধন করে নেই। কারণ যারা কাজ করে তাদেরই ভুল হতে পারে, যারা কাজ করে না তাদের ভুলও হয় না।”
১১ আগষ্ট ২০১৪ |

সর্বশেষ সংবাদ