শীতলপাটির শীতল পরশ [ মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন]

পোস্ট করা হয়েছে 04/07/2014-12:40am:    গ্রীষ্মের প্রচন্ড গরমে চোখবুজে একটু শান্তিতে ঘুমানোর জন্য আরামদায়ক বলে যুগ যুগ ধরে গ্রামবাংলায় শীতলপাটির কদর। গ্রীষ্মের প্রচন্ড তাপে অতিষ্ঠ যখন প্রাণীকুল, প্রকৃতির এই নির্বিচার আর তার সাথে আধুনিক সভ্যতার বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের মধ্যে মানুষগুলো যেন এক অসহায় চিত্র। আর এ জন্যই একটু শীতলতার পরশ পেতে মানুষ যেন যুগে-যুগে কৌশলী রূপে তৈরি করে আসছে শীতলপাটি। বিদ্যুতের এই দুর্ভোগের মধ্যে শুয়ে-বসে একটু শান্তি পেতে শহরেও অনেকে শীতলপাটি রাখেন। তবে বিভিন্ন কারণে শীতলপাটির ব্যাপক ব্যবহার এখন আর নেই। এর পরও কিছু মানুষ নাড়ির টানের মতো ধরে রেখেছেন এই পাটি বোনার পেশাকে। মিরসরাই ্উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামে গেলে দেখা মিলবে তাঁদের।তবে উপজেলার সবচেয়ে বেশী শীতলপাটি তৈরী হয় মিঠাছড়া,মিঠানালা,কাটাছড়া,বামনসুন্দর,ইছাখালী,রহমতাবাদ,এছহাক ড্রাইভারহাট,সুফিয়া,লোদ্বাখালী, সহ আশপাশের এলাকায়।এসব গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেই এই পাটি বোনার কাজ হয়।এসব পরিবারের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম মাধ্যম এই শীতলপাটি বোনা।সাধারনত ঘরের মহিলারা শীতলপাটি বোনার কাজ করে থাকে।ঘরের বৌ-ঝিয়েরো একসাথে বসে আনন্দের সাথে কাজটি করে। অনেক দরিদ্র ও অসহায় নারী শীতলপাটি বুনে সেগুলো বিক্রি করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন। উত্তর চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় শীতলপাটির হাট ও বসে এই উপজেলায়।মিঠাছড়ায় সাপ্তাহিক রবিবার ও বৃহস্পতিবার এবং বামনসুন্দর বাজারে সাপ্তাহিক শনি ও বুধবার এই হাট বসে।এসব দিনে খুব ভোরে ভোওে শীতলপাটির বেচাকেনা শুরু হয়ে সকাল ৭ টার ভেতর শেষ হয়ে যায়।শহরের পাটি বেপারীরা গিয়ে এসব হাট থেকে পাটি কিনে নিয়ে যায়।এসব পাটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যায়। শীতলপাটি ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের পাটি বোনা হয় এসব এলাকায়।। একটি বড় সাধারণ পাটি ৭০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হয়। একই মাপের একটি শীতলপাটি বিক্রি হয় ৯০০ থেকে ২৫০০ টাকায়। এ ছাড়া মাঝারি ও ছোট আকারের শীতলপাটিও আছে। এগুলো আয়তন অনুযায়ী বিভিন্ন দামে বিক্রি হয়। তৈরীর পক্রিয়া : প্রথমে বাজার থেকে পাটিগাছ কিনতে হয়, যা ‘মোর্তাক গাছ’ নামে পরিচিত। বাঁশের কঞ্চির মতো দেখতে এই গাছ সাধারণত নদী, খাল ও পুকুরপাড়ে এবং পরিত্যক্ত জমিতে জন্মে থাকে। এক আঁটি মোর্তাকের দাম পড়ে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। বাড়িতে এনে কাঁচা গাছ দা দিয়ে পাতলা করে ফালি করতে হয়। একেকটি গাছ তিন ফালি করে কাটা হয়। ফালির প্রথম অংশ ‘নেল’ বলে পরিচিত। এটি দিয়ে পাটি বোনা হয়। শেষ অংশ ‘বুকা’ বলে পরিচিত। এটি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত হয়। পানিতে ভিজিয়ে আবরণ ছাড়িয়ে তোলা হয় দুই রকমের বেত। এরপর রং দিয়ে তা রাঙানো হয়। শুরু হয় পাটি বোনা। এর মধ্যে রয়েছে নকশা, দুই ধারা, এক রঙা, ফুলপাটি, দাড়িপাটি। নেল পাতলা করে কেটে গরম পানিতে সেদ্ধ করতে হয়। তারপর এতে কখনো রং লাগিয়ে, কখনো বা রং ছাড়া শীতলপাটি বোনা হয়। এভাবে পাঁচ হাত দীর্ঘ ও চার হাত প্রস্থ একটি পাটি বানাতে একজন কারিগরের ছয়-সাত দিন সময় লাগে। শীতলপাটিতে গাছপালা, লতাপাতা, পশুপাখি, জ্যামিতিক নকশা, মসজিদ, মিনার, পালকি, নৌকা, হাতি-ঘোড়া ইত্যাদি নানা নকশা পাটিপাতার বুননের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। সাধারণ শীতলপাটিতে ১-২ দিন এবং উন্নতমানের শীতলপাটি তৈরিতে ৩-৪ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। মিঠাছড়া বাজারে শীতলপাটি কিনতে আসা বেপারী নুরুল আবছার বলেন, মীরসরাইর বিভিন্ন বাজার থেকে শীতলপাটিসহ অন্যান্য পাটি কিনে নিয়ে তারা শহরের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করেন। তবে চাহিদার তুলনায় শীতলপাটির সরবরাহ কম। প্রতিটি পাটি বিক্রি করে তাঁদের ১০০ থেকে ২০০ টাকা লাভ হয়। বাজারে পাটি কিনতে আসা একজন ক্রেতা ১০০০ টাকা দিয়ে একটি মাঝারি আকারের শীতলপাটি কেনেন। তিনি বলেন, গরমের সময় তোশকের ওপর শীতলপাটি বিছিয়ে শুলে আরামে ঘুমানো যায়। বিলুপ্তির পথে শীতলপাটি ঃ বাংলাদেশের হস্তশিল্পের মধ্যে প্রায় বিলুপ্ত একটি শিল্প হচ্ছে শীতলপাটি। সময়ের পরিক্রমায় বহুল ব্যবহারের তকমা হারিয়ে ফেলেছে শীতলপাটি। এক সময় বাংলার ঘরে ঘরে শীতলপাটি ব্যবহার হলেও প্লাস্টিকের পাটি বা কার্পেট সহজলভ্য হওয়ায় শীতলপাটি এখন হুমকির মুখে।পাটিপাতা শিল্পের সঙ্গে জড়িত পাটিকররা জানান, এ ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের প্রসারে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নিলে দিনদিন বৃদ্ধি পাবে দেশজ পাটিজাত দ্রব্যের চাহিদা। শীতলপাটি আমাদের সংস্কৃতির একটি ঐতিহ্য।এখনো এই শীতলপাটি বিভিন্ন আচার-অনুস্ঠানে ব্যাবহার হয়ে আসছে।এমনকি শহরের বিভিন্ন বাসায় ও অনুষ্ঠানে এই পাটি দেখতে পাওয়া যায়।শহর অঞ্চলে শীতলপাটি ব্যাবহার এখন আভিজাত্যের প্রতীক।গ্রামাঞ্চলে এখনো এ পাটির কদর রয়েছে।তারপরেও শীতলপাটি থাকবে বাংলার ঘরে ঘরে এই প্রত্যাশা। লেখক:সাংবাদিক,কলামলেখক।

সর্বশেষ সংবাদ
সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ে মুজিববর্ষে একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনেরও আহ্বান:প্রধানমন্ত্রীর বিএনপির গণতন্ত্র হচ্ছে ‘মুখে শেখ ফরিদ আর বগলে ইট:সেতুমন্ত্রী আইসিটির সমন্বয়ক হান্নান খানের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক সবাই মিলে দিব কর, দেশ হবে স্বনির্ভর:রাষ্ট্রপতি রেল সেতুটির নির্মাণ সম্পন্ন হলে আমাদের দেশ এগিয়ে যাবে:প্রধানমন্ত্রী একুশে পদকপ্রাপ্ত ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন চলে গেলেন না ফেরার দেশে আজ বহু প্রতীক্ষিত বঙ্গবন্ধুর রেল সেতুর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী ব্রেকিং নিউজ »আজ থেকে শীতের প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা সরকারের সরলতাকে দুর্বলতা ভাববেন না:সেুতুমন্ত্রী মিরসরাইয়ে যুবলীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত