চট্টগ্রামের দুঃখই হয়ে থাকবে চাক্তাই খাল [কামরুল হাসান বাদল ]

পোস্ট করা হয়েছে 26/06/2014-12:55pm:    চট্টগ্রামের দুঃখই হয়ে থাকবে চাক্তাই খাল এক সময়ে হোয়াংহো নদীকে চীনের দুঃখ বলা হতো; কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও নদী শাসনের ফলে সে পরিস্থিতি এখন আর নেই। অনেক পরিবর্তনের সাথে সাথে চীনের দুঃখও মুছে গেছে আজ। কিন্তু চট্টগ্রামের দুঃখ বলে খ্যাত! চাক্তাই খাল এখনও দুঃখই হয়ে থাকল চট্টগ্রামবাসীর জীবনে। কর্ণফুলী নদীর অন্যতম শাখা খাল চাক্তাইখাল শত শত বছর ধরে চট্টগ্রাম শহর ও আশেপাশের এলাকার পণ্য পরিবহন ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে অবদান রেখে এসেছে। চট্টগ্রাম শহরে শিরা-উপশিরার মতো প্রবাহিত ছিল অসংখ্য খাল। পাহাড়-টিলা পরিবেষ্টিত এই নগরের জলনিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই খালগুলো অধিকাংশই মিলিত হয়েছে চাক্তাইখালের সাথে। অসংখ্য খালের মিলনের ফলে ভাটির দিকে প্রশস্ত হতে হতে এক সময় চাক্তাই নামক স্থানে এই খালটি কর্ণফুলী নদীতে পতিত হয়েছে। সম্ভবত এই কারণে খালটির নামকরণও হয়েছে চাক্তাই খাল। বঙ্গোপসাগরের সাথে কর্ণফুলীর সংযোগ বা কর্ণফুলীর মোহনাকে কেন্দ্র করে হাজার বছর আগে যে রূপ চট্টগ্রাম বন্দর ও বন্দরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম গড়ে উঠেছে তদ্রুপ চাক্তাই খালের মোহনাকে কেন্দ্র করে এর আশে-পাশে গড়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা কেন্দ্র। দেশের প্রধান পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ। এখান থেকে পণ্য কিনে ব্যবসায়ীরা নৌকা-সাম্পানে করে জেলাসহ দেশের নানা স্থানে নিয়ে যেতেন। পণ্যবাহী বড় বড় নৌকা ও সাম্পান এই চাক্তাই খাল কখনও এর শাখা খাল দিয়ে শহরের নানা স্থানে এমনকি বহদ্দারহাট পর্যন্ত যেতে পারতো। পণ্য পরিবহন, জল নিষ্কাশন ছাড়াও এই খাল ও এর শাখা খালগুলো ছিল বিভিন্ন প্রকার মাছের উৎস। কর্ণফুলীতে পাওয়া যায় এমন সব মাছই পাওয়া যেত চাক্তাই খাল ও এর অসংখ্য শাখা খালসমূহে। স্বাধীনতার পর থেকে বিশেষ করে গত শতকের ৭০ দশকের পর থেকে জনসংখ্যাবৃদ্ধির সাথে সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য ও নানা কর্মসংস্থান বাড়তে থাকে শহরমুখী জনতার স্রোত। জনতার চাপ বৃদ্ধির সাথে সাথে শহরের আয়তনও বাড়তে থাকে দ্রুত। বাড়তে থাকে জায়গা জমির দাম। আর এর খেসারত দিতে থাকল খাল ও জলাশয়গুলো। মানুষের অপরিনামদর্শিতা, অতি লোভ ও লালসার কারণে দখল হতে থাকল খাল ও জলাশয়গুলো দখলে দূষণে একসময়ের খাল নালায় পরিণত হলো আর নালাগুলো বিভিন্ন অপচনশীল বর্জ্যে ভরাট হতে থাকল। এভাবে ক্রমে ক্রমে বর্ষা বা বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের প্রায় সব পথ নিশ্চিহ্ন হতে হতে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়াল যে, এখন কয়েক ইঞ্চি বৃষ্টিপাতেই জলাবদ্ধতা হচ্ছে নগরীতে। মাত্র কয়েকঘণ্টার বৃষ্টিতে নগরের কী হাল হয় তা আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। কারণ এখনও পানিবন্দী অবস্থায় আছে কয়েক হাজার মানুষ। এভাবেই প্রয়োজনের চাক্তাই খাল চট্টগ্রামের দুঃখ হয়ে উঠল। গত শতকের ৮০ দশকের মধ্যসময় থেকে চাক্তাই খাল খননের দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম দানা বাঁধতে থাকে। যদিও সে সময়ের পরিস্থিতি আজকের মতো এতটা ভয়াবহ ছিল না। এই আন্দোলন সংগ্রামের ফলে চাক্তাই খাল খননের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে কর্তৃপক্ষ। বিএনপি নিয়োজিত মীর নাছিরের মেয়র থাকাকালীন চাক্তাই খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয় যা পরবর্তী মেয়রদের সময়েও অব্যাহত থাকে। একটি সময়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে চাক্তাই খাল খননই সিটি করপোরেশনের যেন অন্যতম একটি কাজ হয়ে দাঁড়াল। অনেক মতামত, অনেক আলোচনা, অনেক বিশেষজ্ঞ নিয়ে চাক্তাই খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হলো। মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়র থাকাকালীন চীন থেকে বিভিন্ন প্রকার মেশিনপত্র আনা হলো। এক সময় চাক্তাই খালের তলদেশ পাকা করা হলো। খালের পাশে দেওয়াল দিয়ে দুপাড়ে মানুষ চলাচলের পথ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলো আর সে সাথে প্রতি বছর চাক্তাই খালসহ অন্যান্য খাল খনন, সংস্কার ও দখলমুক্ত করার তথাকথিত কর্মোদ্যোগ চলতে থাকলোএখন ফি বছর শুধু খাল খননবাবদ কোটি কোটি টাকা খরচ হতে থাকল আর তার বিনিময়ে একটু বৃষ্টিতেই চট্টগ্রাম নগরী জলে ভাসতে থাকল। এরপরেও আমাদের মেয়র মহোদয় ও কাউন্সিলরদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা! দেখে বাইরের বৃষ্টির চেয়েও আমাদের ভেতরটা সিক্ত হতে থাকল বেশি বেশি। চাক্তাই খাল খননের নামে সিটি করপোরেশনের শত শত কোটি টাকা অপচয়, দুর্নীতি ও লুটপাটের পরে বলা হচ্ছে এখন নতুন করে কিছু খাল কাটতে হবে। পূর্বেই উল্লেখ করেছিলাম-পাহাড়ি এলাকা বলে এই শহরেই শিরা-উপশিরার মতোই প্রবাহিত ছিল অসংখ্য খাল-ছড়া ইত্যাদি। এছাড়া এই শহরেই ছিল কয়েক হাজার পুকুর দীঘি জলাশয়। মানুষের লোভের কাছে হারিয়ে গেছে হাজার হাজার পুকুর দীঘি, শহরের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে অনেক অনেক খাল।গত চল্লিশ বছরে এই সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ খাল-দীঘি জলাশয়গুলো রক্ষা করতে পারেনি এখন চসিক বলছে নতুন করে খাল খননের কথা। আমরা এই নগরেরই সন্তান। প্রতি বছর খাল খননের নামে কীভাবে সিটি করপোরেশন তথা জনগণের টাকার শ্রাদ্ধ করা হয়েছে তা আমাদের অজানা নয়। খাল কেটে তার মাটি খালের পাড়েই রাখা হতো যাতে বৃষ্টিতে সে মাটিগুলো আবার খালে গিয়ে পড়ে ফলে পরের বছর আবার খাল কাটার কাজ আর তার জন্য লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ এসব এখন ‘ওপেন সিক্রেট’ ব্যাপার। এই শহরের প্রতিটি নাগরিকই জানে খাল খননের নামে লুটপাটের কাহিনী। এখনতো ‘খাল খননই’ হয়ে উঠেছে সিটি করপোরেশনের দুর্নীতি ও লুটপাটের একটি অন্যতম উৎস। এই পরিস্থিতিতে জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। গত কয়েকদিনে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা দেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ত্বরিৎ হস্তক্ষেপ করেছেন। বহদ্দারহাট বাড়াইপাড়া হতে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খননের এই প্রকল্প গত ৩ বছর ধরে ঝুলে ছিল। একনেকের সভায় এই প্রকল্প অনুমোদন হওয়ার সাথে সাথে অবশ্য এর কৃতিত্ব নেওয়ার ধুমও পড়ে গেছে। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিপাত ও তাতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা দেখে আবার নতুন করে প্রশ্ন জেগেছে বিগত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন মেয়রের মেয়াদকালে চাক্তাইখালের জন্য কতটাকা খরচ করা হয়েছে এবং এর বিনিময়ে কাজ কতটুকু হয়েছে। ৩০০ কোটি টাকার নতুন এই প্রকল্প শুরুর আগে আমরাও তা জানতে চাই। আমরা চাই চাক্তাই খাল নিয়ে এই পর্যন্ত কত টাকা খরচ করা হয়েছে তার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হোক। এবং এই দুর্নীতি, লুটপাট ও অপচয়ের সাথে জড়িত স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আর ঠিকাদারদের নাম প্রকাশ করা হোক। এ মুহূর্তে যখন নগরবাসীর বড় বিড়ম্বনার নাম জলাবদ্ধতা এবং তা নিয়ে সারাদেশে চলছে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা সে সময়ে বর্তমান মেয়র তাঁর মেয়াদকালের শেষ বাজেট ঘোষণা করলেন যেখানে জলাবদ্ধতা দূরীকরণের কোনো নতুন প্রস্তাব নেই। অথচ আজ থেকে চার বছর আগে এমনি জলাবদ্ধতার দিনে-জলাবদ্ধতা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। একটি বিষয়ে বর্তমান মেয়রসহ সাবেক মেয়রগণ এক ও অভিন্ন কক্তে কথা বললেন। আর তা হলো সরকারি অনুদানে অপ্রতুলতা। আমরা চট্টগ্রামবাসীরা চট্টগ্রামের বঞ্চনার কথা জানি অবহেলার কথা জানি। জানি চট্টগ্রামের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণের কথাও। তবে একটি কথা এখনও স্পষ্ট জানি না তা হলো চাক্তাই খাল খননের পেছনে এ পর্যন্ত কত টাকা, কী ভাবে ও কোথায় খরচ করা হয়েছে তার খবর। আর এর জন্যেই শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানাচ্ছি। E-mail - [email protected].com

সর্বশেষ সংবাদ