বাদল দিনের প্রথম কদম ফুলের কথকতা

পোস্ট করা হয়েছে 22/06/2014-11:44pm:    প্রথম কদম ফুল... ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান/আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান।’....হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের এই গান যখনই শুনি চোখের উপর ভেসে উঠে বর্ষা ঋতু। আর এখন বর্ষা এলো। আষাঢ় এলো। শ্রাবণ আসবে। বৃক্ষ শাখার শোভা পেল কদমফুল। কিন্তু, ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে’ বলতে পারলাম না। বলা হল না, ‘এমন দিনে তারে বলা যায়/এমন ঘন ঘোর বরিষায়’। অন্তত এখনও বলা হল না। জানালার কাছে বসে বিষণ্ণ মৃদু আলোয় স্মৃতি নিয়ে লুকোচুরি খেলা অন্যমনে হল না। যেমন পাওয়া যায় কালিদাসের কাব্যে ‘মেঘদূতে’, বিরহী যক্ষ মেঘকে নিজের বিরহের বিবরণ বহন করে প্রেয়সীর কাছে পৌঁছাবার অনুরোধ করে। বর্ষা ঋতু বিভিন্ন কবির কাব্যে কথায় বিভিন্নভাবে এসেছে। চর্যাকারদের থেকে শুরু করে ঈশ্বর গুপ্ত, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ-আধুনিক অনেক কবি এই বর্ষাকে নিয়ে কাব্য করেছেন। বিদ্যাপতির পদে ‘ময়ূর নাচেত মাতিয়া/মত্তদাদুরী ডাকে ডাহুকী/ফাটি যাওত ছাতিয়া’। বর্ষার আগমনে মেঘের গর্জনে ময়ূর নাচ কবির কল্পনা আমাদেরও বড়বেশী আচ্ছন্না করে। বর্ষার শূন্যতায় বিষণ্ণ একা একা কেবলি আমরা বিরহী যক্ষের মতো বারবার ফিরে যাই আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে মেঘের কাছে, কিংবা গীতবিতানের গানে গানে, ‘সঘন গহন রাত্রি, ঝরিছে শ্রাবণ ধরা।’ সেই বর্ষা এখনো নামলো না। যদিও জানি, বর্ষার বারি বর্ষণের উল্টো পিঠে দুঃখ লেখা থাকে। আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে... আষাঢ়ের প্রথম দিনে জাতীয় দৈনিকে রিপোর্টা, কখনো লেখক বা কবি বিশেষ কলাম লিখে থাকে। এরকমই একটি কলাম লিখেছিলেন কবি মহাদেব সাহা।‘....কালিদাস আষাঢ়ের প্রথম দিনটির বর্ণনা দিয়েছেন। ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে মেঘমাশিষ্টসানুং’; সে বহুকাল আগের কথা, তবু আষাঢ়ের আগমনের সঙ্গে আজো আমাদের মনে এই কাব্যপঙতি গেঁথে আছে। আর তাই তো মনে হয়, ‘বহু যুগের ওপরা হতে আষাঢ় এলো আমার মনে’। মানুষের মনের মধ্যে যে সজল স্নিদ্ধতার তৃষ্ণা আছে, একটুখানি স্নেস্পর্শের ব্যাকুলতা আছে, সেই ভালবাসার সদ্যফোটা প্রথম কদম ফুলের নাম আষাঢ়; রুক্ষ তাপিত বিধুর বিশুদ্ধ হৃদয় মাসের পর মাস এই সজলটুকুর জন্য অপেক্ষা করে, তার অন্তরে যে ফোটার গোপন বাসনা আছে, যে মিনের অপার বেদনা আছে আষাঢ় তাকেই পূর্ণতা দিতে চায়: এই নশ্বর জীবনকে সে করে তুলতে চায় চিরায়ত, ‘আমি যেন বলি, আর তুমি যেন শোনো/জীবনে-জীবনে তার শেষ নাই কোনো’, তবে কি আষাঢ় এক জীবনে এই অনন্ত জীবনের স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে আমাদের মনে? মুহূর্তের জন্য হলেও জীবন মনে হয় মধুময়, ভালবাসার সাধ জাগে, এই রূঢ় রুক্ষ বিবর্ণ পৃথিবীকে মনে হয় বড়ো সুন্দর, বড়ো প্রিয়, বড়ো আমার, তখন সবকিছুই কেমন ভালো লাগে, সুখ বোধ হয়, পেতে ইচ্ছে করে, স্পর্শ করতে ইচ্ছে করে, বাঁচতে ইচ্ছে করে; তবে কি আষাঢ় মানুষের মনে এই সঞ্জীবিত হওয়ার স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে, হয়তো তাই সে তাকে করে তোলে আরো বেদনাহত, আরো ব্যথিত, ‘কেঁদেও পাবে না তাকে বর্ষার অজস্র জলাধারে’, শেষ পর্যন্ত এই বিরহবিধুর মাসের নামই বরষা; আমি নিজে এই বর্ষা খুব অনুভব করি, বর্ষার আমি সুখবোধ করি, ‘বর্ষা আমার জন্মঋতু, আমি জন্মেছি বর্ষায়, বলা যায় বর্ষা আমার প্রাণের সঙ্গে মিশে আছে, ‘আমার নিজের মনের মধ্যে সর্বদাই একটি নিভৃত নির্জন বর্ষাকাল আছে, বর্ষণ ও বৃষ্টিধারা আছে, আমি তার মধ্যেই নিরন্তর স্বস্তি বোধ করি, নীলিমাবিস্তৃত মেঘমালা দেখতে পাই, ফুল ফুটে ওঠে; গাছে গাছে সবুজ পাতা আরো সবুজ হয়, প্রকৃতি হয়ে ওঠে স্নিগ্ধ কোমল মনোরম, এর মধ্যে একটি দিনও বাঁচা কী আনন্দের, একটি মুহুর্ত জেগে থাকাও কী সুখকর; এতো কোলাহলের মধ্যে, কর্কশতার মধ্যে, পীড়নের মধ্যেও এখনও মাঝে জীবন যে আমাদের মুগ্ধ ও বিমোহিত করে, আবিষ্ট ও আচ্ছন্ন করে তা হয়তো এই বর্ষার অকৃপণ উদার বর্ষণধারার জন্যই, তার ভয়ংকর রুদ্র রূপের কথাও তো জানি, তবু তাপদগ্ধ ধরিত্রীকে সে করে তোলে কোমল, শোভিত, রূপময়, মানুষ মনে মনে এই বর্ষা রচনা করে, মেঘ রচনা করে, সেই ‘আশ্চর্য মেঘদল’। আজ এই বর্ষা মেঘ প্রকৃত অর্থে আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, নগর জীবনের গ্লানি ও কৃত্রিমতার মধ্যে আমাদের জীবন আজ বেশিরভাগ সময় ক্লিষ্ট ও মলিন, টিনের চালে সেই অবিরাম বৃষ্টির শব্দ, নদীর জলে লাফিয়ে পড়া সেই সরপুটি, সেই মাটির সোঁদা গন্ধ, বেলফুলের ঘ্রাণ, তার কোন কিছুই হয়তো আর সেভাবে ফিরে পাওয়ার উপায় নেই, তবু আজো বর্ষা আসে, মেঘ আসে, আষাঢ় আসে; আজো ফুল ফোটে, পাখি গান গায়-আর তাই ‘দুয়ার পানে মেলে অাঁখি/কেবল আমি চেয়ে থাকি..’। কদম ফুল এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ... অতি সাধারণ গাছ কদম। কদম গাছের ফুলটিও সাধারণ, কিন্তু গুণে সুগন্ধিতে ফুলটি কিন্তু অনন্য। কদমকে বলা হয় বর্ষার বাহন। বর্ষার দূত। কদম ফুল ফোটে বর্ষার আগমনী গানের সঙ্গে একান্ত হয়ে। প্রাচীন কাল থেকেই কদম ফুল সমাদৃত লোকগাঁথায় সাহিত্য ও ধর্মীয় উপাধ্যানে। মধ্যযুগীয় লোকসাহিত্যে কদমের গুণ কীর্তন নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক মূল্যবান পঙ্তি। লোকগীতিতে এই পয়ারটি অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে সারাদেশে। বৈষ্ণব সাহিত্যে কদম্ব গাছ ও কদম্ব ফুলের মহিমায় ভয়ে জয়কীর্তন করা হয়েছে বারবারই। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও কদম ফুল নিয়ে তাঁর কাব্যভুবন সমৃদ্ধ করেছেন। উপেক্ষিত অথচ পরানের গহীনে মনের মাধুরী মিশিয়ে কদম বাঙালি তরুণ-তরুণীকে করেছে চিরদিনই আত্মভোলা, আত্মহারা। বৃষ্টির রিমিঝিমি ছন্দের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বিশাল তরুর অজস্র কদম যখন ফুটে বর্ষার ভেজা বাতাসে তার গন্ধ সৃষ্টি করে এক মদির আমেজ। রূপে রসে গন্ধে কদম আমাদের রূপসী তরুর প্রথমাদের মধ্যে অন্যতমা। এ তরু দীর্ঘাকৃতি। বহু শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত এবং কদম বয়সও পায় ভাল। কদমের প্রকৃতি : কদমের পাতা ৫-৯ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়। পৃষ্ঠদেশ রোমশ, উজ্জ্বল সবুজ, কচি গাছের পাতা সবুজ ও বৃহৎ। কদম ফল : গোলাকৃতি হলুদ বর্ণ, মাংসল এবং দুই থেকে আড়াই ইঞ্চি প্রশস। এর ফল মাংশল ও টক। কাঠবিড়ালীর প্রিয় খাদ্য। বাঁদুড় ও কাঠবিড়ালীরাই কদমের বীজ ছড়ায়। পুষ্পের ধরন : অত্যন্ত ক্ষুদ্র নলাকৃতি, পুষ্পাধার অজস্র সংখ্যায় বিকীর্ণ। দ্রুত বর্ধনশীল গাছ কদম দ্রুত বেড়ে উঠে বলে গ্রামবাংলায় কদম কাঠের কদর ভাল। দামে সস্তা, টেকসই কম। বাক্স, পেটরা, ছোট খাটো পিঁড়ি ও চৌকির কাজে কদম কাঠ ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া জ্বালানির জন্য কদমের ডালপালাও ব্যবহৃত হয়। কদমের উপকারিতা : কদমের ছাল জ্বরে উপকারী ও টনিক হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কদমের সৌন্দর্য : ছাতার মতো অসংখ্য পত্র পলবের অধিকারী কদম গাছ দেখতেই শুধু সৌন্দর্যময় নয় পথিকদের ছায়াদানেও ভূমিকা রাখে। কদমের মঞ্জরি নিঃসন্দেহে এক অনন্য সৌন্দর্য ও মদির গন্ধের অধিকারী। বলের মতো গোলাকৃতি কদম মঞ্জরি অজস্র ফুলের সমাহারে এক অনন্য দৃশ্যের সৃষ্টি করে। পূর্ণ প্রস্ফুটিত মঞ্জরির রং সাদা হলুদে মেশানো। একমাস তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণকারীরাই কদম মঞ্জরির সৌন্দর্য অনুধাবন করতে পারবেন। অতি সাধারণ উপেক্ষিত কদম গাছ ও ফুল বৈষ্ণব ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তির সঙ্গে প্রস্ফুটিত কদম তরু বৈষ্ণব সাধনার একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। চীন এবং মলয়-এর আদি নিবাস হলেও কবে কখন কোন সময়ে রূপসী কদম আবহমান বাঙালির সাধারণ কৃষকের ঘরের কোনায় ঠাঁই নিয়েছে তা বলা মুশকিল। যে সময়েই কদমের আবির্ভাব হোক না কেন এ দেশে কদম কিন্তু ভাবুকদের জন্য এক স্বপ্নীল জগৎ সৃষ্টি করেছে। কদম ফুল ফুটলেই যেন বর্ষা আসে। কদম ফুল নিয়ে উপরোক্ত নানা তথ্য সমৃদ্ধ নিবন্ধনটি লিখেছিলেন শামসুদ্দোহা চৌধুরী। পুনশ্চ : প্রথম কদম ফুল...... আজ মনে পড়ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়কের দু’পাশে সারি সারি কদম গাছের কথা। এ সময় এই কদম গাছ ফুলে ফুলে ভরে উঠে। ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে হাতে কদম ফুল দেখা যেতো। কদম ফুলের শোভা কিংবা স্পর্শ মাদকতা অনুভব করার মতো। সেই অনুভবের স্মৃতি সেই সময় এখনো হয়তো আমার মতো কারো কারো মনে দোলা দেয়। মনে পড়ে সেই দিনের সোনাঝরা দিনগুলো।

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক