অন্য পরিবারগুলোর দায়িত্ব কে নেবে তবে ।কামরুল হাসান বাদল

পোস্ট করা হয়েছে 07/06/2014-10:36am:    গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নারায়ণগঞ্জের শামসুজ্জোহা পরিবারের বিশেষ করে মরহুম জোহার অবদানের কথা স্মরণ করে বলেছেন, ‘যদি তাদের প্রয়োজন হয় দেখাশোনা করব।’ অর্থাৎ শামীম ওসমান পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী কিংবা জননেত্রী হিসেবে যাঁরা শেখ হাসিনাকে চেনেন তাঁরা জানেন তিনি একজন স্নেহবৎসল ও কৃতজ্ঞ মানুষ। আমরা অতীতেও দেখেছি তাঁর দুর্দিনে যাঁরা তাঁর পাশে ছিলেন পরে তাঁদের তিনি কোনো না কোনোভাবে পুরস্কৃত করার চেষ্টা করেছেন। খুব দূর অতীত নয়, ১/১১ এর পরে তাঁর রাজনৈতিক সংকটকালে যাঁরা তাঁর পক্ষে থেকে কাজ করেছেন খুব বেশি যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তাদের বেশ কজনকে তিনি মন্ত্রী করেছেন। অবশ্য এর উল্টো ঘটনাও ঘটেছে, অর্থাৎ সে সময় যাঁরা তাঁকে গৌণ করার চেষ্টা করেছে বলে মনে করেছেন পরবর্তীতে দলে, সরকারে ও রাজনীতিতে তিনি তাঁদের দীর্ঘকাল গৌণ করে রেখেছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতির খবরাখবর যাঁরা কিছুটা হলেও রাখেন তাঁরা অবশ্য স্মরণ করতে পারবেন বঙ্গবন্ধুর সাথে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন প্রভাবশালী ব্যক্তি মরহুম শামসুজ্জোহার ঘনিষ্ঠতা কেমন ছিল। অনেকে জানেন আওয়ামী লীগের বিকাশ ও এই দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জোহা সাহেবের বাড়িতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, ১৯৭৫ সালে জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার পরে বিপর্যস্ত ও অসহায় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনার পাশে পিতার স্নেহ নিয়ে উপসি’ত ছিলেন মরহুম শামসুজ্জোহা। অবশ্য এ কথাগুলো তিনি সেদিন সংসদেও উচ্চারণ করেছেন। সংসদ সদস্যদের মধ্যে এসব যাঁরা জানতেন না তারাতো জানলেনই, সে সাথে জানল নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশের মানুষ। প্রধানমন্ত্রী যে কৃতঘ্ন নন তা তাঁর আবেগময়ী বক্তৃতায় বোঝা গেল বেশ। সে সাথে তিনি এই ওসমান ভ্রাতৃত্রয়ের মধ্যে সদ্যপরলোকগত জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের কথাও উল্লেখ করেছেন। মূলত আলোচনাটি হয়েছিল নাসিম ওসমানের শোক প্রস্তাবের ওপর। জোহা সাহেবের সন্তানদের সবার নামের শেষে ওসমান থাকায় নারায়ণগঞ্জসহ দেশব্যাপী এই পরিবারটি ওসমান পরিবার হিসেবেই বেশি পরিচিত। আওয়ামী ঘরানার এই পরিবারটি নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে। এবং তা করতে গিয়ে বিভিন্ন অনৈতিক কাজেও তাঁরা জড়িয়ে গেছেন। একদিন পরিসি’তি এমন পর্যায়ে গেল যে, খোদ আওয়ামী লীগের কাছেই বোঝা হয়ে উঠল এই পরিবার। এক সময়ের দলীয় সম্পদ কীভাবে দলীয় বোঝা হয়ে ওঠে- এই পরিবার তারই একটি প্রমাণ। শামীম ওসমান প্রথম বিতর্কিত হয়েছিলেন ১৯৯৬-২০০১ আওয়ামী শাসনামলে। সে সময় টানবাজার থেকে পতিতা উচ্ছেদ, বিভিন্ন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া এবং এক সময় দলীয় কার্যালয়ে বোমা হামলার শিকার হওয়া ইত্যাদি কারণে পত্রিকার শিরোনাম হয়েছেন শামীম ওসমান। এক সময়ে নারায়নগঞ্জে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় তিনি এতই মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন যে, ফেনীর জয়নাল হাজারী, লক্ষ্মীপুরের আবু তাহের, বরিশালের হাসনাত আব্দুল্লাহর সাথে তাঁর নামও প্রধান শিরোনাম হয়ে আসতো গণমাধ্যমে। গত ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবির জন্য ছাত্র ও যুবলীগের মাস্তানি, টেন্ডারবাজীর সাথে এই চারজনকে সমানভাবে দায়ী করা হতো। এই অভিযোগ শুধু সংবাদমাধ্যমের ছিল না, নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরপর অনেক আওয়ামী লীগ নেতাও এ অভিযোগ করেছিলেন। ফলে নির্বাচনের পরপর দেশত্যাগে বাধ্য হন তিনি। ঐ সময় শামীম ওসমানের পরিবার এতটাই বিতর্কিত হয়ে পড়েছিল যে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে শামীম ওসমানের পরিবর্তে তাঁর আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় নায়িকা কবরীকে। সম্পর্কে কবরী শামীম ওসমানদের চাচী হলেও নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়ে পারিবারিক কোন্দলের জের ধরে সারোয়ার সাহেব কবরীকে তালাক দেন। তারপরেও সেখানে কবরী নির্বাচন করে জয়লাভ করেন। শামীম ওসমানদেও দাপটের কারণে কবরী নির্বাচিত এমপি হয়েও এলাকায় সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারেননি। যেমন বিরোধিতার শিকার হয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জেই প্রথম নির্বাচিত মেয়র ডা. আইভি। এসবই পুরনো খবর। দেশের মানুষ তা ভালোভাবেই অবগত আছেন। এভাবে দিনদিন ওসমান পরিবারের বিতর্কিত কাজের পরিমাণ বেড়েছে একদিকে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এদের থেকে। আর জনসমর্থন হারিয়ে শামীম ওসমানরা একসময় মাস্তান ও পেশি নির্ভর রাজনীতির প্রতি ঝুঁকেছেন। আর এমন রাজনীতির যে ধারা বা ফল তাই চলেছে এতকাল নারায়ণগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জ হয়ে উঠেছে মৃত্যুপুরী, ভয়, আতঙ্ক আর গুজবের নগরী। গত কয়েক বছরে নারায়ণগঞ্জে বেশ কিছু হত্যা-গুম-অপহরণ, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজীর ঘটনা ঘটেছে। আর সবকিছুর জন্যেই দায়ী করা হয়েছে নতুবা অভিযোগের আঙুল উঠেছে শামীম ওসমান ও তাঁর পরিবারের প্রতি। আমরা জানি না এসব অভিযোগ সত্যি কি না, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে দুর্বল করার চেষ্টা কিনা, অথবা উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপাবার চেষ্টা কি না, তবে অভিযোগ উঠেছে শামীম ওসমানের নামে, আমরা শুধু এ টুকুই বলতে পারি। সমপ্রতি শামীম ওসমান আবার সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর ৭ খুনের ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছেন নিহতদের পরিবারের সদস্যরা। অভিযোগকারীদের সাথে সাথে নারায়ণগঞ্জবাসীদেরও অভিযোগ এই হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত বর্তমানে পলাতক নুর হোসেন শামীম ওসমানের ঘনিষ্টজন। ফাঁস হয়ে যাওয়া একটি টেলিফোন সংলাপেও দেশবাসী শুনেছেন শামীম ওসমানকে নুর হোসেন কী ভাবে সম্বোধন করছেন এবং নূর হোসেনকে দেশত্যাগ করার জন্যে শামীম ওসমান কীভাবে পরামর্শ দিচ্ছেন। শামীম ওসমানের কথা বিশ্বাস করে আমরা যদি ধরেও নিই যে, এ হত্যাকান্ডের সাথে শামীম ওসমান জড়িত নন তবে এটুকুতো অন্তত বলতে হবে যে, অভিযুক্ত নুর হোসেনের সাথে শামীম ওসমানের সম্পর্ক অত্যন্ত গাঢ়, না হলে সর্বোচ্চ বিপদে মানুষ কার শরণাপন্ন হয়। দ্বিতীয়ত শামীম ওসমান নুর হোসেন অভিযুক্ত বা অপরাধী জেনেও কী করে তাঁকে দেশত্যাগে সাহায্য বা পরামর্শ দিতে পারলেন। টেলিফোনের এই কথোপকথন কি শামীম ওসমানকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার যৌক্তিকতাও দাঁড় করায়নি। ব্যক্তিটি যদি শামীম ওসমান না হয়ে নারায়ণগঞ্জের বিএনপি নেতা তৈমুর আলম হতেন এমন কি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বা প্রভাবশালী কোনো নেতা হতেন তাহলে জিজ্ঞাসাবাদতো দূরের কথা গ্রেফতারও এড়াতে পারতেন কি? ঘটনার পরে শামীম ওসমান অনেকবার মিডিয়ার সামনে এসেছেন- নিজের কথা বলার বা তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন। এরপরে আবারও প্রশ্ন ওঠে এক্ষেত্রে শামীম ওসমান না হয়ে কোনো ওসমান গনি হলে কি এতদিন কথা বলার সুযোগ দেওয়া হতো। সেদিন সংসদে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় শামীম ওসমান নিজের মৃত্যু বা হত্যার আশঙ্কা ব্যক্ত করে সবার কাছে মাপ চেয়েছেন। প্রশ্ন হলো শামীম ওসমান কাদের ভয় পাচ্ছেন? কোনো সরকারি বাহিনীকে? না কি তার প্রতিপক্ষ অন্য গ্রুপের কাউকে? গডফাদার উপন্যাসটি যাঁরা পড়েছেন কিংবা ছবিটি যাঁরা দেখেছেন তাদের নিশ্চয়ই মনে থাকার কথা ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, অর্থ ও নারীর জন্যে কী অবলীলায় খুন করা হয়- অপর পক্ষকে। শুধু তাই নয়, নিজের বহুদিনের বিশ্বস্ত লোকদের হাতেও মৃত্যুবরণ করতে হয় দোর্দণ্ড প্রতাপশালী গডফাদারকে। মোঘল সম্রাটদের মতো এ জগতে পুত্রও হয় পিতার হত্যাকারী বা ভাই হয় ভ্রাতৃঘাতি। প্রধানমন্ত্রী সেদিন সংসদে দাঁড়িয়ে যখন এই শামীম ওসমান পরিবারের পাশে থাকার ঘোষণা দিলেন সে সময় আমার খুব জানতে ইচ্ছে করেছিল খুন হওয়া সাতটি পরিবারের প্রতিক্রিয়া, দেখতে ইচ্ছে করেছিল বেদনার্ত হতাশ যে মুখগুলোকে যারা প্রতিটি প্রহর গুনছে স্বজন হারানোর দুঃসহ বেদনা নিয়ে। জানতে ইচ্ছে করেছিল সারাদেশে শত শত পরিবারের করুণ অনুভূতি যাঁরা এমনি করে অপহরণ ও হত্যার মাধ্যমে তাঁদের স্বজনদের হারিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর এবং তাঁর পরিবারের দুঃসময়ের সাথী একটি পরিবারের পাশে থাকবেন এটি কোনো দোষের নয়, কিন’ ভাবনার বিষয় হলো পরিবার কি মরহুম শামসুজ্জোহা সাহেবের সেই পরিবার, যে পরিবার বাংলাদেশের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামে উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছিল না কি এটি শামীম ওসমানদের পরিবার, নারায়ণগঞ্জের যে কোনো বিতর্কিত, নিন্দিত কাজের সাথে জড়িয়ে আছে এই পরিবারের নাম। জননেত্রী শেখ হাসিনাতো দেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি যে দলেরই হোন- প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সব দলের সব মানুষের, সব পরিবারের। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবিনয়ে একটি আবেদন রাখতে চাই যে, গুম, খুন, অপহরণ আতঙ্কে আছে সমগ্র দেশবাসী, প্রতিটি পরিবার। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনাকে আগে থাকতে হবে এসব লক্ষ লক্ষ পরিবারের সাথে। বিতর্কিত কারও সাথে নয়। দু-চার পাঁচটি ওসমান পরিবারের জন্য লাখ লাখ পরিবারের বিরাগভাজন হওয়া কখনই সমীচিন হবে না মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবী জোরালো হবে এটি বুঝতে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। লেখক : সাংবাদিক, কলামলেখক

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক