এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না।[কামরুল হাসান বাদল ]

পোস্ট করা হয়েছে 15/05/2014-11:25am:    এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না কবি নবারুন ভট্টাচার্য অন্য এক বাস্তবতায় বেশ আগে লিখেছিলেন, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না।’ সে কবিতার একটি অংশ- এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না/ এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না/ এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না/ এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না... আজ এই পংক্তি উচ্চারণ করতে গিয়ে আমার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। আমার জিহ্বা অনড় হয়ে যাচ্ছে। আমার শ্বাস আটকে যাচ্ছে, আমার বুকের পাঁজর ভেদ করে কান্নার রোল নদীর মতো প্রবাহিত হতে চাইছে। আমি বলতে পারি না-আমি পারি না বলতে-৫২ এর চেতনায় গড়া এই দেশ আমার না, ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশ আমার না, প্রায় সাড়ে তিন লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া এই দেশ আমার না, জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা আমার দেশ না। আমি বলতে পারি শুধু এই দেশ আমার তা কোনো হন্তারকের নয়, এই দেশ আমার, তা কোনো জল্লাদের নয়, এই দেশ আমার, তা কোনো দুর্বৃত্তের নয়, এই দেশ আমার তা কোনো নির্দিষ্ট বাহিনীর নয়। নারায়ণগঞ্জের সাত অপহরণ ও খুনের ঘটনার পরে সারা দেশের মানুষ আজ চরম উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় কালাতিপাত করছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, গুম-খুনের আতঙ্কে ভুগছে। কারণ নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনাই শেষ ঘটনা নয়। এরপরেও দেশজুড়ে আরও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। সত্যিকার অপহরণের সাথে সাথে বানোয়াট অপহরণের ঘটনাও ঘটছে অবিরাম। বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই নারায়ণগঞ্জে অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সংবাদপত্রের নিয়মিত পাঠক ও টেলিভিশন চ্যানেলের নিয়মিত দর্শকরা এখনও প্রতিদিন সে সংক্রান্ত তথ্য পাচ্ছেন। বর্তমান যে ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচিত হচ্ছে তেমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। এতগুলো লোককে দিনে দুপুরে প্রকাশ্যে অপহরণ করা হলো, আর তারপরে তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো এমন ঘটনা বাংলাদেশে প্রথম। মঙ্গলবারে পাওয়া পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টে বলা হয়েছে উদ্ধার হওয়ার ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা আগে তাদের হত্যা করা হয়। অনেকে মনে করছেন পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিলে হয়ত তাদের জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হতো। এ বিষয়ে নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের শ্বশুর দুটি গুরুতর অভিযোগ এনেছেন পুলিশ ও র‌্যাবের বিরুদ্ধে। তিনি অভিযোগ করেছেন থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে তাঁকে র‌্যাব অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাঁর দ্বিতীয় অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর। তার ভাষায় ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে র‌্যাব তাঁর জামাতাসহ অন্যদের হত্যা করেছে। এই লেখাটি যখন লিখছি (মঙ্গলবার-মধ্যরাত) তখন কয়েকটি টিভি চ্যানেলে এবং চ্যানেলের টক শো’তে প্রদর্শিত বুধবারের কয়েকটি পত্রিকায় এই বিষয়ে আর ও বিস্তারিত রিপোর্ট করা হয়েছে। কয়েকটি পত্রিকায় একজন মন্ত্রীপুত্রের মধ্যস্থতার বিষয়েও লেখা হয়েছে। লেখাটি প্রকাশ হওয়ার আগেই অর্থাৎ বৃহস্পতিবারের মধ্যে আরও অনেক কিছু হয়ত প্রকাশ হয়ে যেতে পারে। যদি এসব অভিযোগ সত্যি হয়ে থাকে তবে তা রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের নিরাপত্তার বিষয়ে অনেক সংশয় বিতর্ক ও প্রশ্নের জন্ম দেবে। স্বীকার করি সমাজ এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি নিষ্ঠুর ও নির্দয় হয়ে উঠেছে। হানাহানি, হিংসা, দ্বেষ, মারামারি, খুন খারাবি অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন যে চিকিৎসকরা মানুষের জীবন বাঁচানোর পেশায় জড়িত তাদেরও নিষ্ঠুর ও নির্দয় আচরণে মৃত্যু ঘটছে অনেক নিরপরাধ রোগী তথা জনগণের। (এ প্রসঙ্গে পরের সপ্তাহে লেখার আশা রইল) অন্তত বিগত প্রায় এক বছর অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ থেকে ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সাধারণ নির্বাচনের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সারাদেশ জুড়ে জামায়াত-হেফাজত-বিএনপির ধ্বংস-নৈরাজ্য হত্যার উৎসব দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে মানবতাবোধ ভ্রাতৃত্ব সৌহার্দ ও সহানুভূতি লোপ পেয়েছে। এটি আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের কথা নয়। মনোবিদরাই বলে থাকেন টেলিভিশন সিনেমার অতিরিক্ত ভায়োলেন্সপূর্ণ ছবি দেখলে দর্শকের মধ্যেও তা সংক্রমিত হয়, তারাও সহিংস আচরণ করতে অভ্যন্ত হয়ে ওঠে। আর তা যদি নাটক-সিনেমা না হয়ে বাস্তবচিত্র হয় তবে তার প্রভাবতো বহুগুণ হতে বাধ্য। এমন নিষ্ঠুর পরিবেশ থেকে এরশাদ সিকদারদের মতো সিরিয়াল খুনীদের জন্ম হয়, যারা দীর্ঘদিন বিচারহীনতার কারণে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। দেশ বিদেশের নানাবিধ চাপ ও বৈরীতাকে উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা দেশকে বর্তমান অবস্থায় এনেছেন। অন্যতম প্রধান একটি রাজনৈতিক শক্তি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা সত্ত্বেও তিনি একটি নির্বাচন করতে সক্ষম হয়েছে। বলা যেতে পারে আপাতত সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে পেরেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি পরাক্রমশালী রাষ্ট্রের হুমকিকে উপেক্ষা করে দেশকে মোটামুটি একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থানে আনতে সক্ষম হয়েছেন। এমন একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেও তাঁর সরকার টিকে যেতে পারে শুধুমাত্র দুটি চ্যালেঞ্জ শক্তভাবে মোকাবেলা করতে পারার মধ্য দিয়ে। তার একটি দুর্নীতি কমানো ও অন্যটি দেশের ‘ল এন্ড অর্ডার’ অর্থাৎ আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা অথচ এমন পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জের মতো ঘটনা এবং সারাদেশে সংঘটিত গুম ও খুনের ঘটনা তাঁর সমস্ত অর্জন ও কর্মপরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। ভাবতে হবে এমন ঘটনা যারাই ঘটিয়ে থাকুক তারা কখনোই বর্তমান সরকারের বন্ধু নয়। তা কোনো দলীয় লোক, তার বাইরের কিংবা কোনো বাহিনীর লোক হোক। এক কথায় একে বলতে হবে স্যাবোটাজ। এমন সব ঘটনার সাথে যদি আওয়ামী লীগের দলীয় কেউ জড়িত থাকেন তবে তার বিচারই আগে হওয়া উচিত। তাকে কিংবা তার অনুসারীদের চিহ্নিত করা উচিত। মনে রাখতে হবে গায়ে মুজিবকোট থাকলেই শুধু হবে না। মনে রাখতে হবে খন্দকার মোশতাক, কে এম ওবায়দুর রহমান, মোয়াজ্জেম হোসেন, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, কোরবান আলী, শফিউল আলম প্রধানরাও একদিন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ডাক সাইটে নেতা ছিলেন। মনে রাখতে হবে এখনও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারকার্য শেষ হয়নি। সাজা কার্যকর হয়নি। মনে রাখতে হবে সরকারকেই কেউ কেউ জঙ্গিদের অর্থ যোগানদাতা ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে সাফাই গেয়ে গলা শুকিয়ে দেখছেন এখনও। সারাদেশে গুম খুনের মহোৎসব করে সরকারকে যারা বেকায়দায় ফেলতে চাইছেন তারা কোনোভাবেই সরকারের তো নয়-ই একটি মানবিক সমাজ সভ্য সমাজেরই বন্ধু নয়। নারায়ণগঞ্জের ঘটনার পেছনে প্রকৃতপক্ষে কারা জড়িত তা আমরা এখনও জানি না। তবে জানতে বা বুঝতে কষ্ট হয় না যে, তারা অত্যন্ত ক্ষমতাবান দক্ষ ও এমন কাজে পারদর্শী। পত্র-পত্রিকা বা মিডিয়ায় অন্যান্যদের বরাত দিয়ে, এর মধ্যে একজন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও আছেন, যেভাবে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে তাতে বিষয়টি গোপন করা বা ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব হবে না। অথবা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা সফল করাও উচিত হবে না। যে ব্যক্তির দিকে অভিযোগের অঙ্গুলি উত্তোলিত হয়েছে তার প্রতি সদয় আচরণ বা পক্ষপাতিত্ব আখেড়ে ভালো ফল দেবে বলে মনে হয় না। এ ক্ষেত্রে আইনের সর্বোচ্চ শাসন প্রত্যাশা করি এবং আইনকে তার স্বাভাবিক পথে চলতে দেওয়ার দাবিও জানাই। এত মৃত্যুর দায়, এত ক্রন্দন, এত বিলাপের দায় এই সরকার কেন বহন করতে যাবে তার কোনো অর্থও আমি খুঁজে পাই না। একটি মিথ্যা যেমন অসংখ্য মিথ্যার জন্ম দেয় তেমনি একটি হত্যাকাণ্ড অনেক হত্যাকাণ্ডেরও জন্ম দেয়। নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত আগের হত্যাকাণ্ডের যদি সঠিক বিচার হতো, খুনীরা যদি বিচারের সম্মুখীন হতো তবে এত বড় হত্যাকাণ্ড এড়ানো সম্ভব হতো। আর হয়ত অনেক মায়ের বুক খালি হতো না, স্ত্রী-সন্তানের বিলাপে আকাশ ভারী হতো না। বলতো হতো না, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’। স্বজন হারানোর বেদনা, পিতা-মাতা-ভাই-বোন ও নিকট আত্মীয়দের হারানোর বেদনা শেখ হাসিনা ছাড়া আর কে অনুভব করেছে বেশি। শোকের পাথর কে বহন করেছে বেশি। এত শোক এত বেদনা এত হাহাকার ও শূন্যতা নিয়েও তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। নারায়ণগঞ্জসহ দেশের অন্যান্য স্থানের নিখোঁজ গুম ও খুন হওয়া মানুষদের পরিবারের ক্রন্দন নিশ্চয়ই শেখ হাসিনাও শুনতে পাচ্ছেন। তিনি নিশ্চুপ থাকতে পারেন না। তাঁর সরকার, দেশ ও জনগণের কল্যাণের জন্যে এবার নিশ্চয়ই তিনি কঠোর হবেন। এমন ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। পুনশ্চ: আন্তর্জাতিকভাবে যখন র‌্যাবের ভূমিকা দারুণ সমালোচিত হচ্ছে, কোনো কোনো রাষ্ট্র যখন র‌্যাবকে আর প্রশিক্ষণ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানাচ্ছে ঠিক সে মুহূর্তে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার সাথে এই বাহিনীর সম্পৃক্ততা সরকারকে ব্যাপক বিব্রত করবে এবং সে সাথে এই বাহিনী বিলোপের দাবি জোরালোভাবে উচ্চারিত হবে। তাই বিষয়টির গভীর তদন্ত ও ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে।

সর্বশেষ সংবাদ