আজ পঁচিশে বৈশাখ।কামরুল হাসান বাদল | ০৮ মে ২০১৪

পোস্ট করা হয়েছে 08/05/2014-10:12am:    আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৩ তম জন্মজয়ন্তী। বাঙালির প্রাত্যহিক জীবন জুড়ে রবীন্দ্রনাথ। বাঙালির আনন্দ-বেদনা, বিরহ-মিলনের অনবদ্য চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ। প্রত্যূষ থেকে প্রদোষ অবধি নানা রঙে, বর্ণে ও অনুভবে চিরকালীন রবীন্দ্রনাথ। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের রূপকার এই বিশ্বকবির জন্মদিন গভীর ভালোবাসা ও মর্যাদার সাথে পালন করবে জাতি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ বঙ্গাব্দ, ৭ মে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মা সারদাসুন্দরী দেবী। তিনি ছিলেন পরিবারের চতুর্থ সন্তান। তাঁদের পরিবার ছিল ব্রাহ্ম ধর্মের প্রবক্তা। তাঁদের পূর্বপুরুষরা বর্তমান খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগে বাস করতেন। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, সঙ্গীতকার, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোট গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক বা চিন্তক। তাঁর ৫২ টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস, ৩৬ টি প্রবন্ধ ও গদ্য সংকলন আছে। তাঁর যাবতীয় লেখা ও সৃষ্টি ৩২ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। তাঁর নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন- ‘অতি অল্প বয়স থেকে স্বভাবতই আমার লেখার ধারা আমার জীবনের ধারার সঙ্গে সঙ্গেই অবিচ্ছিন্ন এগিয়ে চলেছে। চারিদিকের অবস্থা ও আবহাওয়ার পরিবর্তনে এবং অভিজ্ঞতায় নূতন আমদানি ও বৈচিত্র্যে রচনার পরিণতি নানা বাঁক নিয়েছে ও রূপ নিয়েছে। অন্যত্র লিখেছেন,-‘যে সংসারে প্রথম চোখ মেলেছিলুম সে ছিল অতি নিভৃত। শহরের বাইরে শহরতলীর মতো, চারিদিকে প্রতিবেশীর ঘরবাড়িতে কলরবে আকাশটাকে আঁট করে বাঁধেনি। আমাদের পরিবার আমার জন্ম পূর্বেই সমাজের নোঙর তুলে দূরে বাঁধা ঘাটের বাইরে এসে ভিড়েছিল। আচার-অনুশাসন-ক্রিয়াকর্ম সেখানে সমস্তই বিরল’। রবীন্দ্রনাথ ভাববাদী ছিলেন। তাঁদের পরিবার ছিল একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম। নোবেলজয়ী গীতাঞ্জলির প্রথম কবিতাটি এমন-‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার পরে / সকল অহংকার হে আমার মিটাও চোখের জলে …’। তারপরেও মানুষের স্থান ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে সম্মানের-শ্রদ্ধার। তিনি লিখেছেন, ‘মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ’। তাইতো তাঁর সঙ্গীতেও এর প্রতিধ্বনি পাই- ‘তাই তোমার আনন্দ আমার পর/ তুমি তাই এসেছো নিচে/ আমার নইলে ত্রিভুবনেশ্বর তোমার প্রেম হতো যে মিছে … ।’ যে ঈশ্বরকে তিনি কামনা করেছেন এভাবে- ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই চিরদিন কেন পাই না ……।’ সেই তিনি এক অসীম সাহস ও আত্মবিশ্বাসে বলেন- ‘বিপদে মোরে রক্ষা কর এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে যেন না করি আমি ভয়/ দুঃখ-তাপে ব্যথিত চিতে না-ইবা দিলে সান্ত্বনা দুঃখ যেন করিতে পারি জয়’। বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব অপরিসীম। শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্র তাঁর স্পর্শে সবুজ, গতিময় ও সমৃদ্ধ হয়েছে। পথহীন বাংলা সাহিত্যের অনেক পথ তৈরি করেছেন, অনেক পথের দিশা দিয়েছেন আর নিজের সৃষ্ট পথে বাংলাভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্ব সভায় তুলে ধরেছেন। তারপরেও সৃষ্টিশীল, সৃজনশীল এই মহামানবটি বিনয়ের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে বলতে পারেন-‘আমার জনম গেল বৃথা কাজে, আমি কাটানু দিন ঘরের মাঝে, বৃথাই তুমি শক্তি দিলে শক্তিদাতা ….।’ কূপমণ্ডূকতার পঙ্কিল আবর্ত ছেড়ে বিশ্বমানব হয়ে ওঠার আশ্রয়স্থল রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে বিনয়েরও পাঠ গ্রহণ করতে পারি আমরা। এই অস্থির, নির্মম ও নির্দয় সমাজে অধিকতর রবীন্দ্রচর্চাই পারে শুধু সকল অন্ধকার ঘুচিয়ে আলোর দিশা দিতে। বাঙালির সর্বাঙ্গীণ জুড়ে থাকা বিশ্বকবির প্রতি তাঁর জন্মদিনে কবি দীনেশ দাশের পংক্তি ধার করে বলি- ‘আকাশে-বরুণে দূর স্ফটিক ফেনায় ছড়ান তোমার প্রিয় নাম, তোমার পায়ের পাতা সবখানে পাতা কোথায় রাখব প্রণাম।’

সর্বশেষ সংবাদ