রেলের জায়গা রেলের জমি ঘর বানাইয়া আমি রই [ কামরুল হাসান বাদল ]

পোস্ট করা হয়েছে 03/05/2014-11:32pm:    ‘মানুষ যেখানে থাকার জায়গা পাচ্ছে না, সেখানে রেলওয়ের এত জায়গা খালি পড়ে থাকবে কেন। আর এক ইঞ্চি জায়গাও খালি থাকবে না।’ সংলাপ শুনে মনে হতে পারে এটি এই যুগের কোনো রবিন হুডের, গরিবদের থাকা-খাওয়া নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। প্রবাদ আছে রবিনহুড জোতদার জমিদারদের সম্পত্তি লুট করে তা গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। তবে প্রকৃত রবিন হুডের সাথে এই যুগের রবিন হুডের পার্থক্য হলো যে, প্রকৃত রবিনহুড, আগেই বলেছি ধনীদের সম্পদ বিলিয়ে দিতেন গরিবদের। আর এই যুগের রবিনহুড জায়গা দখল করছেন রেলের সরকারি জমি পক্ষান্তরে যা জনগণের সম্পত্তি। দখল করছেন আবার জনগণ বা গরিব অসহায়দের জন্য নয়। দখল করে করে নিজের সাম্রাজ্যের পরিধি বৃদ্ধি করছেন। ইনি পাহাড়তলী ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর, একজন সরকার দলীয় নেতা এবং একজন সাবেক মন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট। ওনার এমন সব মহৎ(!) কাজের সহযোগী বিএনপি’র অঙ্গ সংগঠন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক এক সময়ের ফ্রিডম পার্টির নেতা, যিনি কুড়াল মার্কা নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছিলেন, এসকে খোদা তোতন। লুটপাট আর ভাগ-বাটোয়ারায় নৌকা আর কুড়াল এখানে এক কাতারে। মোহাম্মদ হোসেন হীরন, সিটি কর্পোরেশনের এই সাবেক কাউন্সিলর রেলের বিস্তর জায়গা দখলে নিয়ে ভালোই ভালোই দিন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সরকার দলীয় বলে তাঁকে ঘাটাতে সাহস করেনি রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অবশ্য যারা এই দুষ্কর্মের সাথে জড়িত নন, এবার তিনি আলোচনায় এসেছেন গত শনিবার নগরের আমবাগান এলাকায় রেলের প্রায় ৩৫টি গাছ কেটে বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনার পর। গত ২৬ এপ্রিল শনিবার প্রকাশ্য দিবালোকে শতবর্ষী কিছু গাছ কেটে ফেলার দৃশ্য দেখে স্থানীয় লোকজন বিস্ময়ে হতবাক। দুয়েকজন সচেতন নাগরিক মোবাইলে ছবি তুলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। গাছ কাটার আগের দিনই দেশের স্মরণকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। প্রচণ্ড তাপদাহে মানুষ যখন একটু ছায়ার জন্য, একটু খোলা হাওয়ার জন্য, একফোঁটা বৃষ্টির জলের জন্য হাহাকার করছিল দেশজুড়ে ঠিক তখনই চরম নির্মমতার সাথে শতবর্ষী এই বৃক্ষরাজী ধ্বংস করেছে কিছু অতিলোভী মানুষরূপী জানোয়ার। অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ, পাহাড় ও অকাতরে গাছকাটা, নদী-খাল-নালা দখল দূষণের কারণে প্রকৃতি যখন বিরূপ হয়ে উঠেছে এবং তার ফলে বিশ্বের তাপমাত্রা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়ে একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে সে সময় এভাবে গাছকাটা একমাত্র বাংলাদেশেই বুঝি সম্ভব। আমবাগানের যে সড়কের গাছ কাটা হয়েছে তা রেলের নিজস্ব রাস্তা হলেও এখন তার উন্নয়ন, নির্মাণ ও সম্প্রসারণের তদারকি করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। এবারও সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক এই রাস্তা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু কাজ শুরুর আগেই বাংলাদেশ রেলওয়ের এই গাছগুলো কেটে ফেলেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার সাবেক কাউন্সিলরের লোকজন, যারা দীর্ঘদিন যাবৎ রেলের জমি দখলের সাথে জড়িত। এই ঘটনা জানাজানি হলে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করা হলে রেল ও সিটি কর্পোরেশন এই দু’প্রতিষ্ঠানই গাছ কাটা প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে। দু’প্রতিষ্ঠানই বলছে তারা গাছ কাটার অনুমতি কাউকে দেয়নি। অথচ দিনে-দুপুরে ঘণ্টার পর ঘন্টা এত বড় বড় গাছগুলো শুধু কুঠার দিয়ে কাটা হচ্ছিল তা চোখে পড়ল না রেল বা সিটি কর্পোরেশন, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কারও। গাছ কেটে তা ট্রাক ও ঠেলাগাড়িতে পাচার হয়ে যাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ জানতে পারল। অবিশ্বাস্য গল্প বটে। কর্তব্যে নিষ্ক্রিয়তার জন্য আন্তর্জাতিক কোনো পুরস্কার থাকলে তা বাংলাদেশ রেলওয়ে ও সিটি কর্পোরেশনকে প্রদান করা উচিত। লক্ষণীয় যে এই সড়কের দু’পাশেই রেল কলোনি এবং এ সড়ক দিয়েই পাহাড়তলী কারখানা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অফিস থেকে সিআরবিতে প্রতিনিয়ত যাতায়াত করে থাকেন রেল কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ। রেলের কীর্তি এখানেই শেষ নয়। ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পরে রেলের যে কর্মকর্তা মামলা করেছিলেন তাকে পরদিন সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দেখে শুনে মনে হচ্ছে রেলের কালো বিড়ালটা ফুলে-ফেঁপে এখন মস্ত চিতা বাঘে পরিণত হয়েছে। রেলের জায়গা দখলকারী শুধু হীরন নন, এমন শত শত হীরন আছেন বাংলাদেশ জুড়ে যারা শুধু রেলের জায়গা দখল করেই বিরাট বিরাট জমিদারে পরিণত হয়েছেন। কোটি কোটি টাকার ধন সম্পদের মালিক হয়েছেন। প্রভূত পরিমাণ জমির মালিক বাংলাদেশ রেলওয়ে। এর অধিকাংশই পরিত্যক্ত অবস্থায়। ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো বড় বড় শহরগুলোতে এ ধরনের খালি পড়ে থাকা জমি দখল করে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা অনেক বছর আগে। প্রতিবছর জমির দাম বাড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রেলের জমি দখলের প্রবণতা ও প্রতিযোগিতা। এবং এ কাজে সবসময় এগিয়ে থাকেন যখন যে দল ক্ষমতায় আসে সে দলের সুবিধাবাদীরা। অনেক ক্ষেত্রে সরকার বদল হলেও দখলবাজের পরিবর্তন হয় না) কারণ এই দখল পক্রিয়ার সাথে সব সময় সর্বদলীয় একটি মোর্চা বা সমঝোতা কাজ করে। লুটপাটকারীদেরতো আর নির্দিষ্ট আদর্শ নেই। ওদের আদর্শই হলো ভাগে-যোগে খাওয়া। নৌকা-কুড়াল-ধানের শীষ (নাঙ্গল) ও দাঁড়িপাল্লা এখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ রেলওয়ের কী পরিমাণ সম্পত্তি বেদখলে আছে তা খোদ রেল কর্তৃপক্ষও জানে না। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বা গণমাধ্যমে দুয়েকদিন বিভিন্ন রিপোর্ট প্রকাশিত হলে তারা লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালায় ফটো সেশনের পরে পরিস্থিতি আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। মাঝে-মধ্যে নাকি ভাড়াটিয়াদের তাড়াতে না পারলে কিংবা ভাড়া-বৃদ্ধি করার ফন্দি হিসেবেও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়ে থাকে। দখলবাজরা সবদলের তবে যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তখন সে দলের লোকরাই পুরো ব্যাপারটি ম্যানেজ করার দায়িত্বে থাকেন। ভাগ-বাটোয়ারার টাকা রেলের পিয়ন থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত বন্টিত হয়ে থাকে। রেল কলোনিগুলোর এমন ঘর পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ যা অনুমতিহীন বর্ধিত করে ভাড়া দেওয়া হয়নি। এসব কলোনির অধিকাংশেই বাস করে রেল বহির্ভূত ভাড়াটিয়ারা। অর্থাৎ রেলের জায়গার অপব্যবহার কত প্রকার ও কী কী তা একজন পয়েন্টম্যান থেকে শুরু করে জি এম পর্যন্ত করে থাকেন। না হলে বিড়ালগুলো চিতাবাঘে পরিণত হচ্ছে কীভাবে। শুধু চট্টগ্রাম শহরের কথাই ধরুন। এই শহর ও শহরতলীর অধিকাংশ জায়গাই রেল ও বন্দর কর্তৃপক্ষের। । চট্টগ্রাম শহরে সরকারি খাস জমি তেমন নেই। এখন যে কোনো ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন ও নির্মাণের জন্য সরকার বা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিশেষ করে রেলের শরণাপন্ন হতে হয়। অথচ রেলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও দামি জায়গা অবৈধ দখলকারীদের কব্জায়। যা কখনও মুক্ত হবে বলে মনে হয় না। রেলের জায়গা অবৈধ দখলমুক্ত না হওয়ার আরও একটি কারণ আছে। রেলের বেশ কিছু সৎ কর্মকর্তা ও কর্মচারী আছেন সংখ্যায় নগণ্য বলে তারা প্রতিবাদ করার সাহস পান না। প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিপদে পড়ার আশঙ্কায় অনেক সময় দর্শকের ভূমিকা পালন করেন। অসীম ক্ষমতাবান দখলদারদের বিরুদ্ধে এরা ব্যবস্থা নিতে চাইলেও নিরাপত্তার জন্য তা পারেন না। কারণ জায়গাতো তাঁর বা তাঁদের একার নয়-রেলের সম্পত্তির জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করতে এগিয়ে আসবে কে? বিপদে পড়লে তাঁর পাশে দাঁড়াবে কে? অন্য অংশটি চালাক ও ধূর্ত। এম.পি, মন্ত্রী বা সরকারিদলের চাপ আছে এমন অজুহাত দেখিয়ে নিজেরাও লাভবান হয়ে থাকেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে। বর্তমানে যে গাছগুলো কাটা হয়েছে তার যে বিচার হবে সে সম্ভাবনা আমি অন্তত দেখছি না। কারণ বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এটিকে গুরুতর কোনো অপরাধ হিসেবে দেখা হবে না। বিশ্বের অনেক দেশে একটি গাছ কাটতে হবে বলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পরিকল্পনা পরিবর্তন বা পরিত্যাগ করা হয়েছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে অবস্থিত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এক নম্বরে। বিশ্বে উষ্ণতা-বৃদ্ধির কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। যার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে দেশের অনেক নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যাবে। এমন একটি ভয়ংকর ও বিপজ্জনক ভবিষ্যতের মুখোমুখী হয়েও আমাদের মধ্যে পরিবেশ রক্ষার কোনো প্রকার তাগিদ ও সচেতনতা তৈরি হয়নি। মুষ্টিমেয় কিছু অতি লোভী মানুষের লালসার কাছে পুরো একটি দেশ, একটি জাতি অসহায়ভাবে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে তা মেনে নিতে কষ্ট হয়। আমাদের দেশে আমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, আমরা যারা মায়ের মতো দেশকে ভালোবাসি। আমরা জেগে উঠলে মুষ্টিমেয় কিছু দুর্বৃত্ত পালানোর পথ খুঁজে পাবে না। আমাদের ভবিষ্যতের চাবি আমাদের হাতেই নিতে হবে। আমাদের হাতেই নির্মিত হতে হবে আমাদের বাংলাদেশ। গাছ কাটতে যতটা কষ্ট পেয়েছি তার চেয়েও বেশি বিস্মিত হয়েছি চট্টগ্রামের তথা দেশের পরিবেশ আন্দোলনকারী ও নাগরিকদের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা দেখে। এঁদের এমন আচরণ অবশ্য নতুন নয়। গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে গত দু বছরে আন্দোলন সংগ্রামের নামে মূলত মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্তদের মুক্তির দাবিতে বিএনপি-জামাত-হেফাজত সারাদেশে লাখ লাখ বৃক্ষ নিধন করেছে। আমরা সে সময়েও ওসব পরিবেশবাদীদের আশ্চর্য নীরবতা অবলোকন করেছি। তাই বলছি কারও জন্যে আর অপেক্ষা নয়। সকল অচলায়তন ভেঙে এগিয়ে আসুক জনতা। নিজেদের রক্ষায় নিজেরাই জাগ্রত হোক। ডাকাতের উপদ্রব হলে আজও গ্রাম বাংলায় রাত জেগে বাড়ি পাহাড়া দেয় মানুষ। আসুন কিছু ডাকাতের হাত থেকে সরকারি সম্পদ তথা আপনার আমার সম্পদ বাঁচাতে দেশ পাহারায় নামি। এই লেখাটি প্রকাশ হওয়ার পরে অনেক শুভাকাঙিক্ষ হয়ত ফোনে বলবেন, কী হবে এসব লিখে। কে শুনবে আপনার কথা। কেন শুধু শুধু নিজেকে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলছেন। তাদের উদ্দেশ্যে আগাম বলি, এভাবে না বলে বলুন আমাদের এলাকা আমরা পহারা দিচ্ছি আপনারটা দিচ্ছেন তো? পূনশ্চ ক্ষমতায় যাওয়ার আগে আমাদের নেতারা থাকেন গণমানুষের সাথে। তার চারপাশে থাকে সৎ, ত্যাগী ও সংগ্রামী কর্মী সমর্থকরা। এ নেতারাই আবার ক্ষমতায় গেলে হয়ে ওঠেন গণ-দুশমন। কারণ তখন তার চারপাশে ঘিরে থাকে সুবিধাবাদী লুটেরা চক্র। যারা তাঁকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। তাঁর ও দলের পতন ত্বরান্বিত করে। সৎ, ত্যাগী ও আদর্শবান কর্মীরা তখন কাছেও ঘেঁষতে পারে না। অথচ আশ্চর্য প্রতিবার পতনের পর এই সত্য অনুধাবন করলেও পুনর্বার ক্ষমতায় গেলে ক্ষমতাবানরা একই আচরণ করেন। Email:[email protected]

সর্বশেষ সংবাদ