সামাজিক মূল্যবোধ এবং একজন আবু তাহের সর্দার কামরুল হাসান বাদল লেখক কবিও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 02/11/2018-01:30pm:    ১. পৃথিবীটা পরিবর্তনশীল। পরিবর্তিত হতে হতে আজ এই রূপে পৌঁছেছে। পরিবর্তনের এই ধারা ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে তা সঠিকভাবে কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। তবে একটি কথা মানতে হবে, গত তিন দশকে যে পরিবর্তনটুকু হয়েছে তা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ব্যাপক, বিশাল এবং তা ঘটেছে অত্যনত্ম দ্রম্নতগতিতে।
এই পরিবর্তনের ঢেউ মানবজীবনেও লেগেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন ও প্রসার মানুষের জীবনযাত্রাকে ভীষণ পাল্টে দিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়নের ফলে বিশ্ব আজ হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। মাত্র একটি মোবাইল সেট যে সংযোগে ব্যক্তিকে সংযুক্ত রাখছে বিশ্বের সাথে প্রতিনিয়ত। এই তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ এবং দ্রম্নত নগরায়ণ বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস’ায়ও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। আমাদের দীর্ঘকালের পারিবারিক ও সামাজিক প্রথাগুলোও এর ফলে ভাঙতে শুরম্ন করেছে। বিশেষ করে তা সামাজিক মূল্যবোধকে কঠিনভাবে আঘাত করেছে।
আমাদের দীর্ঘকালের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনগুলো শিথিল হয়ে পড়ছে, পরিবারগুলো ফ্ল্যাট কালচারে তাদের সনত্মানদের গড়ে তুলছে। এর ফলে সে শিশুরা সমাজবিচ্ছিন্ন, একাকী ও কিছুটা আত্মকেন্দ্রিকভাবে বড় হচ্ছে। কিন’ ২০/৩০ বছর আগে সমাজ বাসত্মবতা এমন ছিল না। গ্রাম বলুন বা শহর বলুন সবখানেই আমাদের সমাজবদ্ধতা ও সামাজিক অনুশাসনগুলো খুব দৃঢ় ছিল। মান্য করে চলবার প্রবণতা ছিল। পাড়ায় পাড়ায় সামাজিক প্রতিষ্ঠান ছিল। সাংস্কৃতিক কর্মকা- ছিল। পাড়ার যে কোনো অনুষ্ঠানে সবার অংশগ্রহণ থাকতো। সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান ও সমাদর থাকতো। এর ফলে সমাজে কেউ অনাচার করলে, অন্যায় করলে তার জন্য সমাজের কাছে জবাবদিহি করতে হতো। সমাজের মুরম্নব্বিদের সিদ্ধানত্ম বা বিচারের বিরম্নদ্ধে প্রতিবাদও হতো না সে সময়।
২. আমি যে বয়ানটুকু উদ্ধৃত করলাম তা একজন ব্যক্তির সমসত্ম জীবনের কর্মকা-কে স্মরণ করে এবং দীর্ঘকাল তা প্রত্যড়্গ করে। তিনি মরহুম আবু তাহের সর্দার। যাঁর পুরো নাম আবু তাহের মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান। সম্পর্কে তিনি আমর শ্বশুর। ১৯৭৯ সাল থেকে আমি তাঁকে দেখছি এবং একটি সময়ের পর আত্মীয়তার সূত্রে দীর্ঘকাল থেকে খুব কাছ থেকে তাঁর জীবনযাপন প্রত্যড়্গ করেছি। এলাকার-প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ মোট চারটি শিড়্গা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি, স্কাউট আন্দোলন, সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকা- অব্যাহত রাখা, সামাজিক সালিশ-বিচার এবং সামাজিক রীতিনীতি প্রতিষ্ঠা ও তা মান্য করার কাজে তিনি তাঁর জীবনকে এক প্রকার বিলিয়ে দিয়েছেন। বিলিয়ে দিয়েছেন বলছি এ কারণে, তিনি মোটেও বৈষয়িক ছিলেন না। পরিবারের জন্য আয় উপার্জন করার চেয়ে বেশি গুরম্নত্ব দিতেন তাঁর সামাজিক কর্মকা-গুলোকে। আমি দেখেছি স্কুলগুলোর যে কোনো অনুষ্ঠানের সময় তিনি দিনের পর দিন খেটেছেন, ভেবেছেন যা তিনি পরিবারের জন্য কখনো করেননি। আমি তো দেখলাম জীবনের প্রায় পুরোটাই তিনি সমাজ, মানুষ, স্কুল, স্কাউটিং ইত্যাদি করে কাটিয়ে দিয়েছেন। নিজের বা সনত্মানদের ভবিষ্যতের কথা ততটুকু ভাবেননি। তাঁর সনত্মানরা যে বঞ্চিত হচ্ছে তা নিয়েও তাকে কখনো চিনিত্মত বলে মনে হয়নি। এতে তাঁর সনত্মানদের মধ্যে কোনো ড়্গোভ বা অভিযোগ ছিল না। কিংবা থাকলেও তা তাঁর সামনে প্রকাশ করার সাহস কখনো করেনি তারা। আর আমি ভেবেছি, সমাজে এমন ব্যক্তিরা আছেন বলে কিংবা ছিলেন বলে সমাজটা অনেক বাসযোগ্য ছিল কিংবা আছে। যে অবড়্গয়ের কথা পূর্বে বলেছি, যে মূল্যবোধের কথা পূর্বে বলেছি তা ধরে রাখা সম্ভব যদি সমাজে আবু তাহের সর্দারদের মতো মানুষ থাকেন। আমাদের দেশে, সমাজে এমন আবু তাহের সর্দার আরও আছেন যাঁরা নীরবে যার যার অবস’ান থেকে তার নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর মতো লোক সমাজে এখনো সক্রিয় আছেন বলে আমাদের সমাজ ব্যবস’া একেবারে হতাশ হয়ে যাওয়ার মতো অবস’ায় যায়নি।
আবু তাহের সর্দারদের মতো লোকগুলো আমাদের তথাকথিত ‘সুশীল শ্রেণি’র অংশ নন। এঁরা সমাজের বিশিষ্টজন হিসেবে বিবেচ্য নন। এঁরা সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে আমন্ত্রিত হয়ে বক্তব্য রাখার সুযোগ পান না। টেলিভিশনের টক শোতে অংশ নিয়ে জাতির সামনে গুরম্নত্বপূর্ণ মতামতও প্রদান করেন না, তবে তাদের মতো লোকরাই সমাজের জন্য, মানুষের জন্য প্রকৃত কল্যাণের কাজটি করেন। সমাজকে বাসযোগ্য করে রাখতে, সমাজের অবড়্গয় ঠেকাতে সক্রিয় এবং সঠিক ভূমিকাটি পালন করেন। সমাজে আবু তাহের সর্দারদের মতো লোক যতবেশি থাকবে সমাজ তত উপকৃত হবে।
রাজনৈতিকভাবে ভীষণ বিভক্ত আমাদের সমাজে সামাজিক বন্ধনের খুব বেশি প্রয়োজন আছে। আর সে সামাজিক বন্ধনকে ধরে রাখতে, অব্যাহত রাখতে, কল্যাণমুখী রাখতে আবু তাহের সর্দার জীবনভর কাজ করে গেছেন। আবু তাহের সর্দারদের মতো লোকদের সম্মান ও স্মরণ করা প্রয়োজন আমাদের নিজেদের স্বার্থে। সামাজিক অবড়্গয় থেকে বাঁচতে হলে, পরিবারপ্রথা বজায় রাখতে হলে, সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে হলে, সমাজে পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ব বাড়াতে হলে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে এ ধরনের ব্যক্তিদের কর্ম ও ত্যাগ তুলে ধরতে হবে। এবং সৎ, কল্যাণ শোভন ও সুন্দরের পথে থাকার প্রেরণা জাগাতে হবে।

সর্বশেষ সংবাদ
গণমানুষের মাঝে গণসংযোগে নৌকার রেজাউল চট্টগ্রামের বিপ্লবী ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত সকল স্থাপনা রক্ষার তাগিদে মশাল মিছিল বইমেলার তারিখ নির্ধারণ হয়নি : সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ফেব্রুয়ারিতে খুলছে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেচ খরচ হ্রাস ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে: কৃষিমন্ত্রী জয়ী হোক ও পরাজয়ী হোক পরবর্তী নির্বাচনে মনোনয়ন পাবে না প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত: সেতুমন্ত্রী খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করেন ইসি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় চলচ্চিত্র নির্মাণের আহ্বান:প্রধানমন্ত্রী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলেন ৩৩ জন চসিকের কার্যক্রম চলমান রাখার নির্দেশনা প্রশাসকের