আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেব আকাশে কামরুল হাসান বাদল ,লেখক কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 19/10/2018-08:23am:    ’ ঢাকায় স্থায়ী হওয়ার পর আইয়ুব বাচ্চু অসংখ্যবার তাঁর জন্মস্থান চট্টগ্রামে এসেছেন। কখনো গানের জন্য, কখনো কোনো পারিবারিক কাজ বা অনুষ্ঠানে। যতবারই এসেছেন সঙ্গে নিয়ে আসতেন ঢাকায় ফিরে যাওয়ার তাড়া। কারণ সেখানে তাঁর অনেক কাজ। তাঁর জন্য অপেক্ষায় আছে কতজন। সেই আইয়ুব বাচ্চু, ৩৪৪ জুবলি রোড, এনায়েত বাজারের নুরুজ্জামান সওদাগরের বাড়ির সবচেয়ে উজ্জ্বল, খ্যাতিমান আর জনপ্রিয় ছেলেটি আগামীকাল চট্টগ্রামে আসছে, আসছে চিরদিনের জন্য। আসছে আর কোনোদিন, কখনো ফিরে না যাওয়ার জন্য। কাল থেকে বাচ্চু অনন্তকালের জন্য আশ্রয় নেবে তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী চট্টগ্রামের মাটিতে, চৈতন্যগলি কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে।
এ দিনটির কথাই যেন বাচ্চু তাঁর গানের মধ্যদিয়ে প্রকাশ করেছিলেন, ‘সবাইকে একা করে চলে যাব অন্ধ ঘরে/ এই শহর গাড়ি বাড়ি কিছুই যাবে না/ আর কত এভাবে আমাকে কাঁদাবে/ আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেব আকাশে/ এই বুকে যন্ত্রণা বেশি সইতে পারি না / আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেব আকাশে।’ অভিমানী বাচ্চু গতকাল সকালে সত্যি সত্যি উড়াল দিয়েছে ‘আকাশে’।
গতকাল সকালে শরীর খারাপ লাগলে আইয়ুব বাচ্চুর ব্যক্তিগত গাড়িচালক তাঁকে নিয়ে স্কয়ার হাসপাতালে যান। গাড়িতে তোলার সময়ই তাঁর মুখ থেকে ফেনা বের হচ্ছিল। সকাল সোয়া নয়টার দিকে তাঁকে স্কয়ারে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকরা জানান, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বাচ্চুর মৃত্যু হয়েছে। তিন সপ্তাহ আগে আইয়ুব বাচ্চু স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ হৃদরোগে ভুগছিলেন। চিকিৎসকরা জানান, তাঁর হার্টে কার্ডিওমাইপ্যাথি ছিল। ২০০৯ সালে তাঁর হার্টে স্টেন্ট পরানো হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বাচ্চুর হার্টের কার্যকারিতা ছিল ৩০ শতাংশ। মৃত্যুর আগের দিন তিনি রংপুরে একটি কনসার্ট করে এসেছিলেন।
দুই সন্তান দেশে ফেরার পর আইয়ুব বাচ্চুকে সমাহিত করা হবে মায়ের পাশের কবরে। আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ এখন রাখা আছে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে। পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। এরপরই আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে ঢাকার জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। জুমার নামাজ শেষে সেখানে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মগবাজারে কাজি অফিস গলিতে আইয়ুব বাচ্চুর গান তৈরির কারখানা ‘স্টুডিও এবি কিচেন’এ শেষবারের মতো নিয়ে যাওয়া হবে। এখানকার আনুষ্ঠানিকতা শেষে চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় জানাজা। চ্যানেল আইয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ আবারও স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে।
আইয়ুব বাচ্চুর জন্ম ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট। তিনি ছিলেন একাধারে গায়ক, গিটারবাদক, গীতিকার, সুরকার ও প্লেব্যাক শিল্পী। এল আরবি ব্যান্ড দলের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। সংগীত জীবন শুরু ১৯৭৭ । ১৯৭৮ সাল থেকে ব্যান্ড সংগীতের চর্চা শুরু করেন। প্রথম ব্যান্ড স্পাইডার । এরপর কিছুদিন ফিলিংস। এরপর যোগ দেন সোলসে। পরবর্তী এক দশক সোলসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সোলস ছাড়ার পর ১৯৯১ সালে নিজে গঠন করেন নতুন ব্যান্ড এলআরবি। প্রথমে এলআরবির পূর্ণ অর্থ ছিল লিটল রিভার ব্যান্ড। পরে এই নাম বদলে করা হয় লাভ রানস ব্লাইন্ড। প্রায় তিন যুগের সংগীতজীবনে আইয়ুব বাচ্চু গানের পাশাপাশি তাঁর গিটারের জাদুতে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। তিনি তরুণদের মধ্যে ক্রেজ তৈরি করেছিলেন। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে মোহবিষ্ট করে রাখা মঞ্চ কাঁপানো রক স্টার। প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রেও গেয়েছেন। যেখানে তাঁর আম্মাজান গানটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলোর একটি ধরা হয়। তিনি অসংখ্য বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলও করেছেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এই উপমহাদেশের অন্যতম সেরা গিটারিস্ট। গিটারকে ভালোবেসে গড়ে তুলেছিলেন একটি গিটার সংগ্রহশালা। বিদেশে যখনই কনসার্ট করতে গেছেন সুযোগ পেলে একবার ঢুঁ মেরেছেন গিটারের দোকানে। আর সেভাবে সংগ্রহ করেছিলেন বিভিন্ন বিচিত্র সব গিটার। দেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে গিটারকে জনপ্রিয় করার অদম্য এক ইচ্ছা ছিল তাঁর। তাঁর সে ইচ্ছা কতটা সফল হয়েছিল জানি না তবে বছর খানেক আগে তিনি তার সংগৃহীত সব গিটার বিক্রি করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।
দুঃখবোধ না থাকলে সম্ভবত শিল্পী হওয়া যায় না। ‘নিজেরে পোড়ায়ে ধূপ গন্ধ বিলায়’ অনেকটা যেন সে ধরনের। বাচ্চুর প্রকৃত দুঃখ কোথায় সে তথ্য হয়ত কোনোদিনই জানব না তবে তার গানের কথাটির মতো জেনে নিতে পারি ‘সুখেরই পৃথিবী/সুখেরই অভিনয়/ যত আড়ালে রাখো / আসলে কেউ সুখী নয়/ নিজ ভুবনে চিরদুঃখী আসলে কেউ সুখী নয়। আইয়ুব বাচ্চু চলে গেছেন। আর কখনো ঝংকৃত হবে না তার অসাধারণ গিটারের মূর্ছনা, তবে বাংলাদেশের সঙ্গীতপিপাসুদের মনে বিশেষ করে তরুণদের হৃদয়ে গিটারের রাজা বাচ্চুর যে সিংহাসন গড়ে উঠেছে তা কখনো চ্যুত হবে না।

সর্বশেষ সংবাদ