মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এই ঐক্য কাজে লাগান-কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 28/07/2016-03:30pm:    ১। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু যখন ৬ দফা ঘোষণা করেন তখন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে অনেকেই তার বিরোধীতা করেছিলেন। কিন্তু তিনি দমবার পাত্র ছিলেন না। আওয়ামী লীগের যেসব নেতা ও কর্মী তাঁর বিশ্বস্ত ছিলেন তাঁদের গিয়ে তিনি তা প্রচারে নেমে গেলেন। এই ৬ দফার পক্ষে ঢাকায় প্রথম প্রকাশ্য সমাবেশ করা সম্ভব হয়নি। চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর এম এ আজিজসহ তৎকালীন নেতৃবৃন্দের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও উদ্যোগে ৬ দফার পক্ষে প্রথম ও প্রকাশ্য জনসভা অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে। এরপর বঙ্গবন্ধু সারাদেশ চষে বেরিয়েছেন ৬ দফার ব্যাখ্যা দিতে ও এর স্বপক্ষে জনমত তৈরি করতে। তাঁর এই প্রচেষ্টা দ্রুত সফল হয়েছিল। মাত্র ৩ বছরে তিনি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। শেখ মুজিব থেকে বাঙালির ‘বঙ্গবন্ধু’তে পরিণত হয়েছিলেন। ৬ দফার পক্ষে তিনি বাঙালির জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন।
২। ১৯৭০ সাল। সামরিক শাসনের মধ্যেও বঙ্গবন্ধু নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করলেন মাওলানা ভাসানিসহ তৎকালীন বামপন্থি কিছু রাজনৈতিক দল। তাঁরা স্লোগান দিলেন ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। বঙ্গবন্ধু তাদের কথায় কর্ণপাত করেননি। ৬ দফার পক্ষে ম্যান্ডেট প্রদানের সুযোগ হিসেবে নির্বাচনকে বেছে নিলেন এবং সফল হলেন। ছয় দফার ভিত্তিতে পাকিস্তান শাসনের পক্ষে বাঙালির জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে প্রমাণ করলেন আওয়ামী লীগ পুরো পাকিস্তানের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী। ফলে দেশ পরিচালনার দাবিদার বাঙালির বৃহত্তম রাজনৈতিক দল-আওয়ামী লীগ।
৩। ১৯৭১ সাল। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করার পরও তৎকালীন পাকিস্তানি শাসক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সংসদ অধিবেশন আহ্বান না করে নানা টালবাহানা অব্যাহত রেখেছেন। পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা বুঝিয়ে না দেওয়ার জন্য নানা ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশের স্বাধিকার আন্দোলন ক্রমশঃ স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। দেশের নানা স্থানে যুদ্ধ প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার জন্য জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলেছেন। ৭ মার্চ তিনি রেসকোর্স ময়দানে বক্তৃতা প্রদান করবেন। অনেকে তাঁকে চাপ দিচ্ছে সেদিনই স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার জন্য। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবং তার স্বভাবজাত ভঙ্গিমায় বক্তৃতা দিলেন। তিনি যা বলেছিলেন তা আজ ইতিহাসের অংশ।
৪। ২০০৮ সাল। ২ বছরের ‘আর্মি ব্যাক্‌ড’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের পূর্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুতে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই ঐক্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এবং ক্ষমতায় গেলে
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নির্বাচনের ব্রুট মেজরিটি নিয়ে বিজয় লাভ করে এবং ক্ষমতায় গিয়ে তারা বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। শীর্ষ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায়ও কার্যকর করে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে ইসলামী জঙ্গিবাদের দ্রুত প্রসার ঘটে। বছর দেড়েক থেকে আইএস নামক জঙ্গিগোষ্ঠী তাদের নৃশংতা ও ব্যাপকতায় বিশ্ব রাজনীতি ও মুসলিম বিশ্বের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাপক ওলট-পালট করে দেয়। সে সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বানচাল করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশেও ব্যাপক জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটানো হয়। দেশে নাস্তিক অ্যাখ্যা দিয়ে লেখক-প্রকাশক ও নিরীহ মানুষদের হত্যা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এবং শেষের দিকে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিত্ব পীর, ইসলামী চিন্তাবিদ, পুরোহিত, ভিক্ষু এ ধরনের ব্যক্তিদের গুপ্তহত্যা শুরু হয়।
৫। ১ জুলাই, ২০১৬। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো রাত। এ দিন রাজধানী ঢাকায় গুলশানে হলি আর্টিজান হোটেলে দেশি-বিদেশি ২২ জন নর-নারীকে গলা কেটে, গুলি করে নির্মম-নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। এর কয়েকদিন পরে হামলা করা হয় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ঈদের জামাতে। এই ঘটনা একটি পরিবর্তন ঘটায় বাংলাদেশে। চিরায়ত, কোমল, সংবেদনশীর বাঙালির মানসে এ ধরনের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে সাধারণ মানুষের মনে। এই দুই ঘটনার পর দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের ব্যাপক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার কারণে মানুষের মনে জঙ্গিবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়। এবং জঙ্গি নির্মূলে একটি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। অপারেশনে নিহত জঙ্গিদের লাশ গ্রহণে অপারগতা প্রমাণ করে সমাজে এদের প্রতি কী পরিমাণ ঘৃণা পুঞ্জিভূত হয়েছে। আজ সমাজের সকল স্তর থেকে জঙ্গি দমনে সরকারকে কঠোর হওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।
৬। এ সময়ে বিএনপি বিবৃতি দিল জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। এবং বিএনপিকে বাদ দিয়ে সে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এরপর বাংলাদেশের কিছু শ্রেণির বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক, বক্তা, সংবাদ মাধ্যম ও কলাম লেখক অবিরাম এই রেকর্ড বাজিয়ে যাচ্ছেন। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবিরোধী জাতীয় ঐক্যের কথা যখন বিএনপি বলছে সে সময়েও একটি অনুষ্ঠানে জঙ্গিবাদের প্রধান উদ্যোক্তা পৃষ্ঠপোষক ও জঙ্গিদল জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর খালেদা জিয়ার পাশেই অবস্থান করছিলেন।
৭। শতকরা ১০০ জনের ঐক্যকে জাতীয় ঐক্য বলে না। এটি কোনো কালে কোনো দেশেই সম্ভব হয়নি। বিশ্বের কোনো স্বাধীনতা যুদ্ধ বা বিশেষ সময়েও শতকরা ১০০ জন একই মত পোষণ করেননি। করা সম্ভবও নয়। এমন কি সব দলের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন দেশের সংখ্যাও কোথাও পাওয়া যাবে না। কোনো না কোনো দল বা গোষ্ঠী তা ক্ষুদ্রই হোক কখনো না কখনো, কোনো না কোনো ইস্যুতে ভিন্নমত পোষণ করেছে। এবার আমার লেখার প্রথম থেকে আসি। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার প্রতি খোদ আওয়ামী লীগেরও অনেকে সমর্থন ব্যক্ত করেন নি। শুধু তাই নয় প্রথম দিকে বামপন্থী রাজনৈতিক দলও ছয় দফা কর্মসূচিকে সন্দেহের চোখে দেখেছে। পরবর্তীতে যখন এই ছয় দফা বাঙালির ‘ম্যাগনাকার্টা’ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে সে সময়েও অনেকে এই কর্মসূচিকে সমর্থন করেন নি। তা সত্ত্বেও এই ছয় দফার পক্ষে ৭০ দশকের শেষভাগে বাঙালির জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় যারা বহুধা বিভক্ত মুসলিম লীগ করতেন, জামায়াতে ইসলামীসহ পাকিস্তানপন্থী দল করতেন তারাতো এই ঐক্যের বাইরেই ছিলেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনে মাওলানা ভাসানীসহ উগ্র বামদের উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু যদি নির্বাচন না করতেন তাহলে তিনি প্রমাণ করতে পারতেন না বাঙালিরা ছয় দফার পক্ষে ম্যান্ডেট দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সারা পাকিস্তানের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। এবং নির্বাচনে জিতে তা সংখ্যাগরিষ্ট হিসেবে ক্ষমতা পাওয়ার হকদার। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। অতি উৎসাহিতদের কথামতো যদি বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে সেদিন সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন তাহলে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হতেন। হতে পারতো বঙ্গবন্ধুকে তারা হত্যা করতো সেদিন এবং বাংলাদেশের স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবেই দেখতো বিশ্ববাসী। ১৯৬৬ সালে যেমন অনেকে ছয় দফার বিরোধীতা করে এই আন্দোলনের বাইরে থেকেছে এবং তা সত্ত্বেও এই ছয় দফার প্রতি জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়েছিল তেমনি নির্বাচনে বিরোধীতা সত্ত্বেও যে নির্বাচন হয়েছিল সে নির্বাচনে ৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল আওয়ামী লীগ বাকি ভোট পেয়েছে বিরোধীরা। তারপরও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন যে স্বাধীনতা তা অর্জনে যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যে অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার বাইরেও অনেকে ছিলেন যারা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পরিচিত।
কাজেই আজকে যারা জাতীয় ঐক্যের কথা বলে বিএনপি-জামায়াত তথা জঙ্গিবাদের উস্কানিদাতাদের সাথে আলোচনার প্রস্তাব রাখছেন তাদের আমি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে বলবো। দেশে সকল স্বাধীনতাকামী, প্রগতিশীল, মানবতাবাদী, উদার, গণতান্ত্রিক শক্তি জঙ্গিবাদ নির্মূলে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলেছেন। এখানে বিএনপি-জামায়াতের অংশ গ্রহণ খুব প্রয়োজনীয় নয়। কারণ ইতিমধ্যে যে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছে তার স্পিরিট ওই রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণও নয়। এই কথা বলে বা দাবি উত্থাপন করে তারা বর্তমান জঙ্গিবিরোধী জাতীয় ঐক্যের মধ্যে ফাটল ধরাতে চায়। বিতর্কিত করতে চায়। এদের চিহ্নিত করে রাখা ভীষণ জরুরি।
৮। বঙ্গবন্ধু যদি সবার মতামতের অপেক্ষা করতেন তবে তাঁর পক্ষে ছয় দফা প্রণয়ন ও উত্থাপন করা সম্ভব হতো না। বঙ্গবন্ধু যদি সবার মতামত গ্রহণ করতেন তবে ১৯৭০ এর নির্বাচনে অংশ নিতে পারতেন না। বঙ্গবনন্ধু যদি সবার মতামত গ্রহণ করতেন তবে ৭ মার্চের পরিস্থিতি সামাল দিতে পারতেন না। বঙ্গবন্ধু যদি সবার মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতেন তা হলে বাংলাদেশ স্বাধীনই হতো না। বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। একটি সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীগণ। সে সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ও সালাহউদ্দিন কাদেরও। অনেকে বলে থাকেন রাজনৈতিক আদর্শে দুজন দু মেরুর হলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল তাদের বন্ধুত্বসুলভ। সালাহউদ্দিন কাদের তার স্বভাবসুলভ ব্যঙ্গ কথাবার্তায় শেখ হাসিনা ও আওয়ামীলীগকে তুলোধুনো করলেন। এরপর বক্তব্য দিতে এসে সুরঞ্জিত সেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন সেদিন। তার বক্তব্যের হুবহু না ও হতে পারে তবে অনেকটা এমন “আমার বন্ধু সালাহউদ্দিন কাদেরের বাবার কথামতো রাজনীতি করলে বঙ্গবন্ধু দেশটাকে স্বাধীন করতে পারতেন না তেমনি তার কথামতো চললে শেখ হাসিনা আজকের এই অবস্থানে আসতে পারতেন না। সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের এই কথাটি আমার কাছে খুব প্রণিধানযোগ্য বলে মনে হয়।
৯। রক্তপাত ছাড়া এদেশে কোনো আন্দোলন সংগ্রাম সফল হয়নি। কোনো দাবি আদায় হয়নি। গুলশান ও শোলাকিয়ার রক্তাক্ত দুটি ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশে জঙ্গিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। মনে রাখতে হবে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় আদর্শ ও চেতনার ভিত্তিতে। বাংলাদেশকে যারা উন্নত, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ উদার শোষণ বঞ্চনা ও দারিদ্র্যহীন দেখতে চান তাদের ভেতর ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আর যারা বাংলাদেশকে পাকিস্তানী ভাবধারায় ফিরিয়ে নিতে চান যারা জঙ্গি উত্থানে মদদ দেন, যারা জঙ্গি ও যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তাদের সাথে জঙ্গিবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠবে কীভাবে। তাদের ভেড়ালেতো জঙ্গিবিরোধী ঐক্যই বিনষ্ট হবে। অতীতে ছয় দফা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমেই সফল হয়েছে। কিন্তু সেখানেও কিছু দল বা দেশের জনগণের একটি অংশের সমর্থন বা অংশগ্রহণ ছিল না। তাই বলে তা ব্যর্থ হয়নি বরং প্রশ্নাতীতভাবে সফল হয়েছে। আজও তাই হবে। এখন প্রয়োজন শুধু এই ঐক্যকে কাজে লাগানো। সারাদেশে প্রতিদিন হাজার হাজার মানববন্ধন শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে জঙ্গিবিরোধী। স্বাভাবিক অবস্থায় সরকারের পক্ষে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন ছিল। কিন্তু বাস্তবতা তা সহজ করে দিয়েছে। পিস টিভি বন্ধ করা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, দেশের প্রতিটি মসজিদে একই খুৎবা পাঠ ও জঙ্গিবিরোধী মনিটরিং করা সম্ভব হতো না। সম্প্রতি ঢাকায় একটি সেমিনারে জাতীয় ঐক্য ও এ নিয়ে করণীয় সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহিম খালেদ বেশ কিছু মূল্যবান পরামর্শ প্রদান করেছেন। যা ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। সরকার তার পরামর্শগুলোকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে পারে। আমি বহুবার বহু লেখায় বলেছি আওয়ামী লীগের যে বিরাট শক্তি ও সম্ভাবনা আছে তা দলের নীতি নির্ধারকরা কাজে লাগাতে পারছেন না। আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোর ভিত্তি ও জনসমর্থন আছে একেবারে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত। যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অন্যান্য সংগঠনের লাখ লাখ কর্মী যদি আন্তরিকতার সাথে জঙ্গিবিরোধী আন্দোলনে নামে তবে দেশ থেকে জঙ্গিবাদ বানের জলের মতো ভেসে যাবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ওদের সেই সদিচ্ছা নেই। রাজনৈতিক কর্মসূচির চেয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারিতেই তারা অধিকতর পারদর্শি। জঙ্গিবাদ বিরোধী এই অভিযান সফল করতে হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে একটি কথা মনে রাখতে হবে। জাতীয় রাজনীতিতে সাধারণ মানুষ যেমন আওয়ামীলীগ ও বিএনপি (মোদ্দাকথায়) এই দু দলে বিভক্ত তেমনি এই বিভক্তি বিরাজমান সরকারের সব পর্যায়ে। প্রশাসন থেকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী সব স্তরেই জঙ্গিবাদ সমর্থিত লোকজন আছেন। কাজেই জঙ্গিবাদবিরোধী যে জাতীয় ঐক্য গঠিত হয়েছে দেশে তা সফল করতে হলে ও বিষয়গুলোও হিসেবে রাখা জরুরি। সৈয়দ ইব্রাহিম খালেদ সাহেবতো স্পষ্ট করেই বলেছেন, প্রয়োজনে ওদের বেতন দিয়ে দিয়ে হলেও বাসায় পুষতে। কারণ সরকারের মধ্যে থেকে এরা সরকারের সকল উদ্যোগ ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করবে। স্যাবোটাজ করবে। বর্তমানে সরকার যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে তাতে জনগণের সমর্থন পাচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে নানা জটিলতা আছে। সাধারণ জনগণ জঙ্গিবিরোধী হলেও অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী বিশেষ করে পুলিশের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের একটি বাক্যও মানুষ বিশ্বাস করে না। জঙ্গিবাদ বিরোধী কর্মকান্ড পরিচালনা ক্ষেত্রে এটি বিশাল অন্তরায় হিসেবে দেখা দেবে। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত সবক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সঠিক তথ্য জনগণকে সরবরাহ করা। সত্যটি অকপটে প্রকাশ করা। নানা জন নানাভাবে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কিংবা ঘটনা ঘটার পরপর বিভিন্ন মন্তব্য করে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করা হয়। জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়। ফলে পরে সত্যটি প্রকাশ করা হলেও জনগণ তখন তা আর বিশ্বাস করে না। জঙ্গি দমনে সরকারকে কঠোর হওয়ার সাথে সাথে স্বচ্ছ ও স্পষ্ট অবস্থানে থাকতে হবে। জঙ্গিবাদ শুধু দেশীয় সমস্যা নয়। এটি এখন বৈশ্বিক সমস্যা। কাজেই সরকারকে অনেক কিছু বিবেচনা করে অগ্রসর হতে হবে। তবে যাই করুক জনগণকে তার সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং তাদের কাছে সরকারের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য স্পষ্ট করতে হবে। তবেই এই জাতীয় ঐক্য কাজে লাগবে। [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ