ইউপি নির্বাচন:জনগনের ভাবনা - মোঃ ওসমান গনি,সাংবাদিক, কলামিস্ট

পোস্ট করা হয়েছে 01/06/2016-10:35pm:    স্থানীয় সরকার প্রশাসনের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন।আর এ নির্বাচনে দেশের জনগন সম্মিলিত ভাবে ভোট প্রদান করে তাদের মনোনীত প্রার্থী নির্বাচিত করবে এটাই হল নিয়ম।কিন্তু এবারের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। দেশে চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পঞ্চম ধাপেও আগের মতো সহিংসতা ও অনিয়ম অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচনের প্রতিটি ধাপেই অস্ত্রের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে।একটি সুষ্ঠ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের এমন পরিবেশ কখনোই দেশের জনগন আশা করে নাই।দেশের জনগনের আশা নির্বাচনে কারা জয়ী হয়েছে সেটা দেখার বিষয় নয়, দেখার বিষয় হল নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হচ্ছে কিনা। যে সুষ্ঠ পরিবেশে নির্বাচন হওয়ার কথা সে নিয়মে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না বলে দেশের সাধারন জনগন মনে করে। এ নির্বাচনে যারা সাধারন জনগনের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন তাদের সংখ্যা খুবই নগন্য।বেশির ভাগ নির্বাচিত প্রতিনিধি হল পেশী শক্তি ও দলীয় প্রভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধি।আবার অনেকে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় ও নির্বাচিত হয়েছে। এটি আমাদের দেশের জন্য খারাপ দিক। নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে ইসি পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতা, আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রতিযোগিতা ও ভোটগ্রহণে অনিয়ম বন্ধ করতে পারছে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সহিংস ঘটনাগুলো যথাযথভাবে মনিটরও করছে না স্বাধীন প্রতিষ্ঠানটি। নির্বাচনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওপর ছেড়ে দিয়ে দায় এড়িয়েছে কমিশন। এতে সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিতে কমিশনের সমতা ও সদিচ্ছা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। গত পঞ্চম ধাপ সহ যে সমস্ত ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে সে সব কয়টিতেই সহিংসতা ছিল । সেটার খবর ও নির্বাচন কমিশন জানেন ,জানার পর ও তিনি এর বিরুদ্ধে কি পদক্ষেপ নিলেন?ইউপি নির্বাচনের প্রথম চার ধাপে ব্যাপক সহিংসতা ও অনিয়মের পরও পঞ্চম ধাপের ভোটগ্রহণে নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপের বাস্তবায়ন নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মধ্যেও ভোটগ্রহণকালে ব্যাপক সংঘর্ষ ও অনিয়ম হয়। স্থানীয় সরকার হচ্ছে আমাদের গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ। তাই গণতান্ত্রিক উপায়ে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এমন প্রত্যাশা ছিল দেশের জনগণের। কিন্তু সরকার দলীয় পরিচয়ে নির্বাচনের নামে রক্তপাত, ব্যালট ছিনতাই, আহত-নিহতের মতো ঘটনায় গণতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যা করছে, প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে নির্বাচন। এর চেয়ে দুঃখজনক কী হতে পারে? পঞ্চম ধাপের ইউপি নির্বাচনেও ১৩ জন নিহত হয়েছেন। ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে নির্বাচনী সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ১০১ ও আহত হয়েছেন প্রায় ৭ হাজার ব্যক্তি। প্রাণহানির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রথম ধাপের নির্বাচনের আগে ১০, নির্বাচনের দিন ১১ ও নির্বাচনের পর থেকে দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ১১ জন নিহত হয়েছেন। দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের দিন ৯, নির্বাচনের পর থেকে তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ১৭, তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের দিন ৫ ও তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের পর থেকে চতুর্থ ধাপ পর্যন্ত ২৩, পঞ্চম ধাপে ১৩ জন নিহত হয়েছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষের জীবনের কি কোনো দাম নেই? অন্যদিকে এ বছর নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি ইতোমধ্যে দেশে এবং বিদেশে রেকর্ড ছাড়িয়েছে। গত ৭মে অনুষ্ঠিত পঞ্চম ধাপের নির্বাচন পর্যন্ত ১৯২ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। ষষ্ঠ ধাপে কতজন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আর ও চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে পারে বলে আশা করা যায়। এর আগে ১৯৮৮ সালের ইউপিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন ১০০ জন। বিষয়টি দেশের জনগনের কাছে হাস্যকর ছাড়া কিছুই নয়! দেশের জনগন মনে করে এ নির্বাচন দেশের মানুষকে তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার নির্বাচন। দেশের জনগন ভাবছিল দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলে দেশের মানুষ তারা তাদের নিজেদের ভোট দিয়ে নিজেরা প্রতিনিধি নির্বাচিত করবে তা হলো না। নির্বাচন কমিশন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন না করার কারনে মানুষ তাদের ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত হলো। দেশবাসীর কাছে নির্বাচন কমিশন হাসির পাত্রে পরিনত হলেন।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন। এতে অনিয়ম-কারচুপির অভিযোগ এনে দুপুরের আগেই চট্টগ্রামে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন মনজুর আলম। ঢাকায় একই ঘোষণা দেন মির্জা আব্বাসের পক্ষে তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাস ও তাবিথ আউয়াল। এ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলাকালে সরকার-সমর্থক নেতাকর্মী ও পুলিশের হামলার শিকার হয়েছেন ২১ সাংবাদিক। গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ২৩০টি পৌর নির্বাচনেও কারচুপির অভিযোগ আনে বিএনপি। এই নির্বাচনে সহিংসতায় নিহত দুজন ও আহত হন দুই শতাধিক। লিখিত অভিযোগ করলেও ইসি এর সত্যতা খুঁজে পায়নি, ব্যবস্থা নেয়নি। এতে কি প্রমাণ হয় না, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ ইসি? সুষ্ঠু নির্বাচনের দায়িত্ব ইসির। ওই দায়িত্ব পালন করতে না পারলে অবশ্যই তাদের সরে যেতে হবে। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।’ ১১৮ অনুচ্ছেদের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবে এবং কেবলই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবে।’ কিন্তু ক্ষমতা থাকার পরও ইসি একেবারেই চুপ, কোথাও ক্ষমতার প্রয়োগ নেই। দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইসিকে সাংবিধানিকভাবেই অনেক ক্ষমতা দেওয়া হলেও এর ব্যবহার দেখা যায় না। কমিশনের হাতে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কঠোর না হওয়ার ফলে সহিংসতা ও অনিয়ম বাড়ছে। ইসি তার ক্ষমতা ব্যবহার করলে ভোটগ্রহণ আরও সুষ্ঠু হতো। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসি ব্যর্থ। ইসির ব্যর্থতাই বলে দেয়, এ নির্বাচনে একটি দলের একক কর্তৃত্ব ছিল। নির্বাচনে সহিংসতা ঘটে। তবে এবারের নির্বাচনে সহিংসতার মাত্রাটি ছিল বেশ ভয়াবহ। এবারের নির্বাচনী সহিংসতার মাত্রাটি দীর্ঘমেয়াদি। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকেই এখন পর্যন্ত এ সহিংসতা চলছে। এটি অতীতে দেখা যায়নি। এ সহিংসতার মাধ্যমে যে বিভেদ সৃষ্টি করা হয়েছে, এটি তৃণমূল পর্যায়ের সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যটি দারুণভাবে বিনষ্ট করবে বলে আমার ধারণা। এ সহিংসতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো সহিংসতার অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে হয়েছে। তাদেরই রক্ত ঝরছে। তারাই এর ভিকটিম হয়েছেন এবং মাশুল দিচ্ছেন। পঞ্চম ধাপের ইউপি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ, বিতর্কিত ও বিকৃত হয়েছে। ইউপি নির্বাচন এক ধাপ শেষ হওয়ার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, আগামী ধাপে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। একে একে পঞ্চম ধাপের নির্বাচন শেষ হয়েছে। কোনো ধাপের নির্বাচনই ইসি সুষ্ঠুভাবে করতে পারেনি। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে কমিশন পুরোপরি ব্যর্থ। প্রমাণ হয়ে গেছে, তাদের অধীন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই ব্যর্থতার দায় নিয়েই তাদের সরে দাঁড়ানো উচিত। আমাদের আশঙ্কা, এর চর্চা সংক্রামক ব্যাধির মতো ভবিষ্যতে রাজনীতির সব স্তরে আরও ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এবারকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আরেকটি অনাকাক্সিক্ষত দিক হলো পেশিশক্তির প্রয়োগ ও সহিংসতার প্রত্যাবর্তন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমনটি কারও কাম্য হতে পারে না। দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতিদিনই নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা, মারধর ও হামলার অসংখ্য অভিযোগ কমিশনে জমা পড়েছে। কিন্তু এগুলোর দুই-একটি ছাড়া অধিকাংশই আমলে নেওয়া হয় না। ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে থাকে এসব অভিযোগ। পঞ্চম ধাপের নির্বাচন তা প্রমাণ দিল। অতীতের নির্বাচনেও রক্তপাত, ব্যালট ছিনতাই, আহত-নিহত হওয়া সর্বপ্রকার ঘটনাই ঘটেছে। এসব বন্ধ করতে না পারলে গণতন্ত্র বলে কিছু থাকবে না। ক্ষমতার বলে ভোটকেন্দ্রে যা খুশি, তা-ই করবে এটি হতে পারে না। ব্যাপক সহিংসতা ও প্রাণহানি, মনোনয়নবাণিজ্যের ব্যাপকতা, রেকর্ড সংখ্যক ইউনিয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া, একটি বড় রাজনৈতিক দল কর্তৃক অনেক ইউনিয়নে প্রার্থী দিতে না পারা, একদলকেন্দ্রিক ফলাফল, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হামলা-নির্যাতন ইত্যাদির কারণে এই নির্বাচন জনগণের দৃষ্টি কেড়েছে। ফলে ব্যাপক সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে। সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো। এ সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। যথাযথ ও যৌক্তিক কাজটি নিরপেক্ষভাবে করে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ ও গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হবে। সামনের নির্বাচনগুলোয় যদি এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হয়, তাহলে দল-মত নির্বিশেষে আমাদের সবাইকেই এখন গভীরভাবে ভাবতে হবে এর পরিণতি নিয়ে।ক্ষমতাসীন সরকারের আমলে এ ধরনের নির্বাচন আশা করে না দেশের জনগন।সরকারের উচিত যে কোন মূল্যে নির্বাচন কমিশন কে দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন করিয়ে নেয়া। যাতে করে দেশের জনগনের কাছে সরকারের ভাবমূতি আরো উজ্জল হয়ে উঠে।সরকারের প্রতি যাতে দেশের সকল শ্রেনীর মানুষের গ্রহন যোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।নির্বাচন সুষ্ঠু করালে দেশ ও বিদেশে আমাদের সুনাম বাড়বে।এবং গনতন্ত্রের ভীত মজবুত হবে । তাতে কোন সন্দেহ নাই।
লেখক: মো: ওসমান গনি,সাংবাদিক কুমিল্লা। তাং ১.৬.১৬

সর্বশেষ সংবাদ
চট্টগ্রামের বিপ্লবী ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত সকল স্থাপনা রক্ষার তাগিদে মশাল মিছিল বইমেলার তারিখ নির্ধারণ হয়নি : সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ফেব্রুয়ারিতে খুলছে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেচ খরচ হ্রাস ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে: কৃষিমন্ত্রী জয়ী হোক ও পরাজয়ী হোক পরবর্তী নির্বাচনে মনোনয়ন পাবে না প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত: সেতুমন্ত্রী খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করেন ইসি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় চলচ্চিত্র নির্মাণের আহ্বান:প্রধানমন্ত্রী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলেন ৩৩ জন চসিকের কার্যক্রম চলমান রাখার নির্দেশনা প্রশাসকের ঘন কুয়াশায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ